ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,

‘আওয়ামী লীগ-বিএনপির চরিত্রে পার্থক্য নেই’: গোলাম পরওয়ার

‘আওয়ামী লীগ-বিএনপির চরিত্রে পার্থক্য নেই’: গোলাম পরওয়ার

ছবি: সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক আচরণে মৌলিক পার্থক্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার অভিযোগ, ক্ষমতার বাইরে থাকলে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও বিরোধী মত দমনের মতো কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ আয়োজিত ‘রক্তে ভেজা ২৮ অক্টোবর, ফ্যাসিবাদের উত্থান: কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে নামের পার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক আচরণে মিল রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, আগে যেভাবে চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কমিটি নিয়ন্ত্রণের ঘটনা ঘটত, এখনো সেসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে সংঘটিত সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ওই ঘটনায় মামলা হলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয় এবং নথিপত্র হারিয়ে যায় বলে তাঁদের অভিযোগ। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এখনো বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগকে যদি সত্যিই হত্যাকাণ্ড ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী মনে করা হয়, তাহলে ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিতে হবে।

২০০৬ সালের ওই দিনের সহিংসতা ঠেকাতে তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, একদিকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতের সমাবেশে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও অন্যদিকে বিএনপির নয়াপল্টনের সমাবেশ নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ বিষয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর ক্ষমতায় গিয়ে সেই অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোর মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় আসার পর গণতান্ত্রিক রীতি ও সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের অতীত শাসনামলের সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও বিরোধী মত দমনের প্রবণতা দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, পরবর্তী সময়ে অগণতান্ত্রিক শাসন, নির্বাচনী বিতর্ক এবং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর সঙ্গে ওই দিনের ঘটনার ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, গুম ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সংস্কার উদ্যোগগুলোর কিছু অংশ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মহানগরী দক্ষিণের মজলিসে শুরা সদস্য ও সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির।

এ ছাড়া ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় নিহত সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামসুন্নাহার রুবি, শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের বাবা তাজুল ইসলাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সেমিনারে বক্তারা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সহিংসতার বিচার, রাজনৈতিক জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।