ছবি: সংগৃহীত
অশুভ শক্তিকে শোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। শুক্রবার ছিল মহাষষ্ঠী। এদিন দেবী দুর্গা শক্তি নিয়ে ভক্তদের কাছে পৌঁছান। পঞ্জিকা অনুযায়ী এবার সপ্তমী পড়েছে দুই দিন। পঞ্জিকা মতে, এবার সপ্তমী তিথি শুরু হবে ১৭ অক্টোবর শনিবার বিকাল থেকে এবং তা থাকবে ১৮ অক্টোবর রবিবার বিকাল পর্যন্ত।
হিন্দু শাস্ত্রমতে সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি থাকে, সারাদিন সেই তিথি ধরা হয়। তিথির সময়কাল ২৪ ঘণ্টার বেশি হওয়ায় দুই দিনের সূর্যোদয়ই পাচ্ছে সপ্তমী তিথিকে।
শাস্ত্র অনুযায়ী, দুই দিন সপ্তমী থাকলেও উৎসবের ক্ষণ গণনায় কোনো প্রভাব পড়বে না। ভক্তরা মহা সপ্তমীর দিনই অঞ্জলি দিতে পারবেন।
হিন্দু পঞ্জিকায় তিথির হিসাব চন্দ্রের গতির উপর নির্ভর করে। কোনও কোনও বছর একটি তিথি দুই ক্যালেন্ডার দিনে বিস্তৃত হয়। ফলে ভক্তরা দুই দিনই মহাসপ্তমীর পূজা, অঞ্জলি ও আরাধনা করতে পারবেন।
আজ মহাসপ্তমী। শাস্ত্রমতে মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদানে) দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। একই সঙ্গে দেবীকে আসন,বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। এসময় পূজারীরা মায়ের সামনে বসে মায়ের মুখ দর্শন করবেন।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ সব মন্দিরেই ভোর সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হবে সপ্তমী পূজার আনুষ্ঠানিকতা। চণ্ডী ও মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে পূজা অর্চনা করা হবে। এছাড়াও দিনব্যাপী চণ্ডী ও মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে পূজা, দেবী-দর্শন, দেবীর পায়ে ভক্তদের অঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা চলবে বলে জানান সর্বজনীন পূজা আয়োজকরা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজা। দেবী আসার ঘণ্টা বেজে যায় মহালয়ার দিন থেকেই। সনাতন ধর্ম মতে, যা কিছু দুঃখ-কষ্টের বিষয়, যেমন— বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ-শোক, জ্বালা-যন্ত্রণা এসব থেকে ভক্তকে রক্ষা করেন দেবী দুর্গা। শাস্ত্রকাররা দুর্গা নামের অর্থ করেছেন— দুঃখের দ্বারা যাকে লাভ করা যায়, তিনিই দুর্গা। দেবী দুঃখ দিয়ে মানুষের সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা করেন। তখন মানুষ অস্থির না হয়ে তাকে ডাকলেই তিনি তার কষ্ট দূর করেন।
বিজয়া দশমী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন। এই দিনটি শেষ হয় মহা-আরতির মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। আগামীকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) অষ্টমী, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মহানবমী এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) দশমীর মাধ্যমে বিদায় নেবেন দুর্গা দেবী। এবার দেবী বিদায় নেবেন নৌকায়।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, দেবী বিসর্জন বিকাল ৩ টায়। সারাদেশে বিজয়ার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এ উৎসব।
অষ্টমীতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা হবে। এদিন রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। অষ্টমীর দিন বিশেষ আকর্ষণ থাকে কুমারী পূজা এবং সন্ধিপূজায়।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীরাম কৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য।
শাস্ত্রমতে, এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।
নির্বাচিত কুমারীকে মহাষ্টমীর দিন ভোরে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তাকে সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে (ষোলো উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি আর দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
নবমীতে মণ্ডপে ভেসে আসে বিষাদের সুর। কারণ দেবী দুর্গার বিদায়ের ঘণ্টা বাজে নবমীতে। এই দিনে আনন্দের মাঝে বিষাদের ছায়াও পড়ে দেবী ভক্তদের মনে। কারণ দেবী দুর্গা দশমীর দিন কৈলাসে ফিরে যাবেন। দশমীর দিন করা হবে প্রতিমা বিসর্জন, অশ্রুশিক্ত চোখে ভক্তরা বিদায় দেবেন দেবী দুর্গাকে।
সনাতন ধর্মমতে, নবমীর পুণ্য তিথিতে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে বিশ্বে শুভ শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন দেবী দুর্গা। নবমী তিথি শুরু হয় সন্ধিপূজা দিয়ে। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট সর্বমোট ৪৮ মিনিটে সন্ধিপূজা হয়। মূলত দেবী চামুণ্ডার পূজা করা হয় এসময়। এ সময়েই দেবী দুর্গার হাতে বধ হয়েছিল মহিষাসুর, আর রাম বধ করেছিলেন রাবণকে। এই দিনই দুর্গাপূজার অন্তিম দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ পরের দিন কেবল বিসর্জনের পর্ব। নবমীর রাতে উৎসবের রাত শেষ হয়। নবমী রাতে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায়ের ঘণ্টা বাজে।
বিজয়া দশমীর দিন মঙ্গলবার বিকাল ৩টার পর থেকে প্রতিমা বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে পলাশীর মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়ে সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন হবে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার এ বছর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ঢাকা মহানগরে ২৬১টি পূজার আয়োজন হয়েছিল। সে হিসেবে মহানগরে তিনটি পূজা কমেছে। এছাড়া সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি। এর মধ্যে প্রতিমার পাশাপাশি ঘটে আয়োজিত পূজাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।























