ঢাকা,  বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

তেলাপোকা পার্টি নরেন্দ্র মোদির জন্য নতুন মাথাব্যথা

বিদেশ

বিদেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:৫৫, ২৯ জুলাই ২০২৬

তেলাপোকা পার্টি নরেন্দ্র মোদির জন্য নতুন মাথাব্যথা

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের তরুণদের সাম্প্রতিক এক আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক দৃশ্যপট কাঁপিয়ে দিয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ নামের এই আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল দিল্লির বিখ্যাত যন্তর মন্তর। এই ঐতিহাসিক স্থানটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রতিবাদের জন্য পরিচিত। তবে মাত্র আট সপ্তাহের কম সময়ে নতুন একটি রাজনৈতিক ধারা তৈরি করে ভারতীয় রাষ্ট্রশক্তিকে পিছু হটতে বাধ্য করার মতো ঘটনা যন্তর মন্তরে আগে কখনো ঘটেনি।

এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে যখন বোস্টনে পড়াশোনা করছিলেন, তখন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান বিচারপতি ভারতের বেকার তরুণ ও সমাজকর্মীদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। দিপকে এই অপমানজনক শব্দটিকে একটি ইন্টারনেট ‘মিম’-এ রূপান্তর করেন। গত ৬ জুন যখন দিপকে দিল্লিতে এসে সিজেপির কার্যক্রম শুরু করেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হ্যাশট্যাগের অনুসারী সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে নাগরিক আন্দোলনগুলোর করুণ পরিণতি দেখে অনেকেই প্রথমে এই আন্দোলন নিয়ে আশাবাদী হতে পারেননি। কিন্তু গত শনিবারের ঘটনা সবার ধারণা বদলে দিয়েছে।

আমি কৌতূহলবশত গত ৬ জুন যন্তর মন্তরে গিয়েছিলাম। সেদিন সেখানে ভিড় ছিল মাঝারি মানের। তবে সাধারণ প্রতিবাদের চেয়ে এটি আলাদা ছিল তরুণদের বিপুল উপস্থিতির কারণে। এর আগে আমি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মোদি সরকারের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে দেখেছি। সেখানে শিক্ষার্থীদের সাহস ও আদর্শ পুলিশি দমন-পীড়ন এবং পরিকল্পিত দাঙ্গার মাধ্যমে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সিজেপির নতুন এই আন্দোলনের ওপরও সেই একই দমন-পীড়নের ছায়া ঝুলছিল।

দেড় মাস পর, গত ২০ জুলাই যখন পার্লামেন্ট অভিযানের দিন ধার্য করা হয়, তখন যন্তর মন্তরের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। আমরণ অনশনের কারণে আন্দোলনের উত্তাপ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সরকার মূল অনশনকারী সোনাম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। সরকারের ধারণা ছিল, তার অনুপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মনোবল ভেঙে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

হাজার হাজার পুলিশ সদস্যের বিপরীতে সেখানে লাখ লাখ তরুণ জড়ো হন। সরকার তরুণদের এই জনস্রোত আঁচ করতে পারেনি। বিকেলে দিল্লি পুলিশ এই বিশাল সমাবেশে লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। এই বর্বরতা দেখে সবাই স্তব্ধ হয়ে যান। কিন্তু তরুণরা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ। তাঁদের হাতের মুঠোফোনগুলো হয়ে উঠেছিল ক্যামেরা ও প্রতিবাদের অস্ত্র। লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের মধ্যেও তরুণদের হাসিমুখে বুক চিতিয়ে লড়াই করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

জামিয়া মিলিয়ার মুসলিম শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেভাবে দমিত হয়েছিল, এই ‘তেলাপোকা আন্দোলন’ সেভাবে ব্যর্থ হয়নি। এর একটি কারণ হলো, এই আন্দোলনে মুসলিম পরিচয়টি প্রধান ছিল না। এটি ছিল মূলত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত ভারতীয় পরিবারগুলোর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তাই সরকার বা মূলধারার গণমাধ্যম একে সহজেই ‘দেশদ্রোহী ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিতে পারেনি।

তা ছাড়া আন্দোলনটি হয়েছিল দিল্লির কেন্দ্রস্থলে, যা পার্লামেন্টের একেবারে কাছাকাছি। সরকার রাজধানীজুড়ে তরুণদের এই জমায়েত নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। পুলিশের লাঠির আঘাত ও টিয়ার গ্যাসের বিপরীতে তরুণদের সাহসের প্রতিটি দৃশ্য ডিজিটাল দুনিয়ায় এক নতুন নাটকের জন্ম দেয়, যা দেশের কোটি কোটি মানুষকে নাড়া দেয়।

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এই দাবি আদায় করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কারণ নরেন্দ্র মোদি রাজনৈতিক চাপের মুখে এর আগে কখনো কোনো ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেননি। নিজের ‘শক্তিশালী’ ভাবমূর্তি ধরে রাখতে তিনি সবসময় অনড় থাকতেন। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। মোদি সরকার প্রথমে নানামুখী আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো কাজ না হওয়ায় অবশেষে তারা নতিস্বীকার করে এবং গত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। আগামী বছর উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মোদি বুঝতে পেরেছিলেন, যন্তর মন্তর-এর এই ক্ষোভ প্রশমিত না হলে বিজেপিকে বড় রাজনৈতিক মাশুল গুনতে হবে।

বামপন্থী ও অনেক বিশ্লেষকের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগ কেবল একটি প্রতীকী জয়, কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন নয়। ধর্মেন্দ্র প্রধানের জায়গায় যাকে নতুন শিক্ষামন্ত্রী করা হয়েছে, সেই প্রলহাদ জোশীও কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএসের সদস্য। তিনি ২০২২ সালে বিলকিস বানু গণধর্ষণ মামলার আসামিদের আগাম মুক্তির পক্ষে জনসমক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। তবে সিজেপি নেতাদের যুক্তি ভিন্ন। তাদের মতে, শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন মূলত মোদির ছায়া। মোদিকে প্রকাশ্যে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করাই ছিল এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তরুণ নেতাদের আত্মবিশ্বাস ও বাগ্মিতা। নিউইয়র্কের তরুণ মেয়র জোহরান মামদানি (৩৫) যেন এই তরুণদের পথপ্রদর্শক। সিজেপির দলিত নেতা দিপকের বয়স মাত্র ৩০ বছর। সরকারের সঙ্গে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী আশুতোষ রাঙ্কার বয়সও একই। আরেক মুখপাত্র সৌরভ দাসের বয়স মাত্র ২৬ বছর। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসার সভাপতি নেহা বোরার বয়স ২৫ বছর। এরা সবাই অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেদের শান্ত রাখার ক্ষমতা রাখেন। যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে একঝাঁক নতুন ‘মামদানি’ বা তরুণ নেতার জন্ম দিয়েছে, যারা ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য স্থায়ী মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখক পরিচিতি: মুকুল কেশবন ভারতের দিল্লিভিত্তিক একজন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও লেখক।