ঢাকা,  শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬,

নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছেন শিল্পীরা

নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছেন শিল্পীরা

ছবি: সংগৃহীত

একসময় শুক্রবার মানেই ছিল নতুন সিনেমার উৎসব। ঈদ, পূজা কিংবা জাতীয় দিবস ঘিরে সিনেমা হলের সামনে দীর্ঘ লাইন, বø্যাক টিকিটের দৌরাত্ম্য, দর্শকের উচ্ছ্বাস আর তারকাদের নিয়ে মাতামাতি-এসব ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের স্বাভাবিক চিত্র। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জনপদ পর্যন্ত সিনেমা ছিল মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন। 
আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। দেশের অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল বন্ধ। অনেক প্রযোজক ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট হাজারো কর্মী পেশা বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকার এফডিসির অনেক ফ্লোর বছরের বড় সময়জুড়েই নিরব। তবে কি সত্যিই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প মৃত্যুর পথে? নাকি এটি কেবল একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নির্মাতা, প্রযোজক, চলচ্চিত্র গবেষক, হলমালিক, পরিবেশক এবং তরুণ দর্শকদের অভিমত, শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে এক জটিল কিন্তু আশাব্যঞ্জক চিত্র।
স্বর্ণযুগের স্মৃতি
স্বাধীনতার পর থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। বছরে শতাধিক চলচ্চিত্র নির্মিত হতো। হাজারের বেশি সিনেমা হলে প্রতিদিন লাখো মানুষ ছবি দেখতেন। চলচ্চিত্র তখন কেবল বিনোদন ছিল না; এটি ছিল সমাজ, সংস্কৃতি, প্রেম, প্রতিবাদ ও দেশপ্রেমের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা। সেই সময়ের তারকারা ছিলেন মানুষের হৃদয়ের অংশ। চলচ্চিত্রের গান গ্রামবাংলার হাটে-বাজারে বাজত। একটি জনপ্রিয় সিনেমা মাসের পর মাস প্রেক্ষাগৃহে চলত। শিল্পটি হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করত শিল্পী, পরিচালক, প্রযুক্তিবিদ, সেট নির্মাতা, পোশাকশিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীত পরিচালক, পোস্টার শিল্পী থেকে শুরু করে প্রেক্ষাগৃহের কর্মচারী পর্যন্ত।
কোথায় হারিয়ে গেল সেই দর্শক?
বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। এটি বহু বছরের অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার অভাব এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থতার ফল। দর্শকের রুচি বদলালেও দীর্ঘদিন একই ধরনের কাহিনি, একই নির্মাণশৈলী এবং একই ধরনের নায়ককেন্দ্রিক সিনেমা নির্মিত হতে থাকে। নতুন গল্প, নতুন ভাষা এবং নতুন চরিত্রের অভাব দর্শকদের ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দুর্বল চিত্রনাট্য। বিশ্বের সফল চলচ্চিত্রশিল্পে যেখানে একটি স্ক্রিপ্ট তৈরিতে মাসের পর মাস গবেষণা চলে, সেখানে অনেক দেশীয় ছবিতে চিত্রনাট্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, দর্শকের সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণ হলো প্রেক্ষাগৃহ। একসময় দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সিনেমা হল ছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে একের পর এক হল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক হল মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা গুদামে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও তা প্রদর্শনের পর্যাপ্ত অবকাঠামো আর থাকেনি। শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দর্শক সিনেমা দেখা ছেড়ে দেয়নি; বরং তারা আরামদায়ক পরিবেশ, উন্নত শব্দ ও চিত্রমান খুঁজতে অন্য মাধ্যম বেছে নিয়েছে। 
বিশ্বজুড়ে যখন ডিজিটাল সিনেমাটোগ্রাফি, ভিএফএক্স, ডলবি সাউন্ড, আইম্যাক্স, অনলাইন স্ট্রিমিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পোস্ট-প্রোডাকশনের যুগ শুরু হয়েছে, তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই আটকে ছিল। অনেক নির্মাতা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করলেও শিল্পব্যাপী পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় দেশীয় চলচ্চিত্র পিছিয়ে পড়ে।
আগ্রহ হারিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা?
চলচ্চিত্র একটি শিল্প, আবার একই সঙ্গে একটি ব্যবসাও। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, বাজার বিশ্লেষণ এবং স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার অভাব ছিল। অসংগঠিত পরিবেশনা ব্যবস্থা, অনিশ্চিত আয় এবং পাইরেসির কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকি নিতে চান না। একজন চলচ্চিত্র উদ্যোক্তার ভাষায়, ‘সিনেমা বানানো কঠিন নয়; কঠিন হলো সেই সিনেমা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।’
পাইরেসি: নীরব ঘাতক
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের অন্যতম বড় শত্রæ পাইরেসি। একটি ছবি মুক্তির কিছুদিনের মধ্যেই অবৈধভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে প্রযোজকের আয় কমে যায়, দর্শক প্রেক্ষাগৃহে যেতে নিরুৎসাহিত হয় এবং নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। ডিজিটাল যুগে পাইরেসির ধরন আরও জটিল হয়েছে।
ওটিটি: প্রতিদ্ব›দ্বী নাকি নতুন সুযোগ?
অনেকেই মনে করেন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম সিনেমা হলের দর্শক কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পুরো সত্য নয়। বিশ্বের বড় চলচ্চিত্রশিল্পগুলো একই সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাজার তৈরি করেছে। বাংলাদেশেও ওটিটি নতুন নির্মাতা, নতুন গল্প এবং নতুন দর্শক তৈরি করেছে। অনেক তরুণ নির্মাতা এখান থেকেই আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাচ্ছেন। অর্থাৎ, ওটিটি চলচ্চিত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সঠিক নীতিমালায় এটি হতে পারে সবচেয়ে বড় সহযোগী। 
নতুন প্রজন্মের দর্শক কী চায়?
বর্তমান দর্শক শুধু তারকাকেন্দ্রিক সিনেমা দেখতে চান না। তারা চায় শক্তিশালী গল্প। চায় আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ। চায় বাস্তবধর্মী অভিনয়। চায় উন্নত শব্দ ও চিত্র। তারা বিশ্বের সিনেমা এক ক্লিকেই দেখে ফেলতে পারে। তাই দেশীয় চলচ্চিত্রকেও সেই মান অর্জন করতে হবে। 
আশার আলোও জ্বলছে
সব সংকটের মধ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি দেশীয় চলচ্চিত্র প্রমাণ করেছে ভালো গল্প, দক্ষ নির্মাণ এবং কার্যকর বিপণন থাকলে দর্শক এখনো প্রেক্ষাগৃহে আসেন। মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির বিস্তার নতুন ধরনের দর্শক তৈরি করেছে। দৈশীয় চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক উৎসবেও প্রশংসা পাচ্ছে। বাংলা ভাষাভাষী বৈশ্বিক দর্শক এখন আগের চেয়ে অনেক বড় বাজার। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলচ্চিত্র পুনরুদ্ধারে সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা দরকার। প্রথমত, চিত্রনাট্য উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্র শিক্ষাকে আরও আধুনিক করতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ জরুরি। চতুর্থত, পাইরেসি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনা বাড়াতে হবে। ষষ্ঠত, চলচ্চিত্র বিপণনকে পেশাদার পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। সপ্তমত, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।
রাষ্ট্রের ভূমিকা
বিশ্বের অনেক দেশে চলচ্চিত্রকে কৌশলগত সাংস্কৃতিক শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর-সুবিধা, অনুদান, আন্তর্জাতিক প্রচারণা এবং চলচ্চিত্র কমিশনের মাধ্যমে সরকার শিল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদি চলচ্চিত্র নীতি বাস্তবায়ন, বিদেশি শুটিং আকর্ষণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে শিল্পটি নতুন গতি পেতে পারে। 
একটি চলচ্চিত্রশিল্প শুধু সরকার বা নির্মাতাদের প্রচেষ্টায় বাঁচে না। দর্শকের অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্মত দেশীয় চলচ্চিত্র হলে গিয়ে দেখা, পাইরেসি বর্জন করা এবং ভালো কাজের মূল্যায়ন করাই পারে শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে। 
সামনে কি নতুন ভোর?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বহুবার সংকট দেখেছে। তবুও প্রতিবারই নতুন প্রজন্ম, নতুন নির্মাতা এবং নতুন গল্প নিয়ে আবারও দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। আজকের বাস্তবতা কঠিন, কিন্তু নিরাশাজনক নয়। যদি শক্তিশালী নীতিমালা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সর্বোপরি ভালো গল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবারও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী শিল্পে পরিণত হতে পারে। পর্দার আলো কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না। কখনো তা ¤øান হয়, আবার সঠিক সময়ে নতুন শক্তিতে জ্বলে ওঠে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন একটাই-আমরা কি এই শিল্পকে হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সম্মিলিতভাবে প্রস্তুত?