ঢাকা,  শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬,

জুলাই বিপ্লবে বিক্ষুদ্ধ ছিলেন শিল্পীরাও

জুলাই বিপ্লবে বিক্ষুদ্ধ ছিলেন শিল্পীরাও

ছবি: সংগৃহীত

আজ ৫ আগস্ট। বিপ্লবী দিনপঞ্জিকায় আজ ৩৬ জুলাই। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু করে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর দেশ থেকে পালিয়ে যায় রক্তপিপাসু ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনা। এক বছর আগের এ দিনে বাংলাদেশ সাক্ষী হয়েছিল এক ঐতিহাসিক গণজাগরণের। শহরের রাস্তাায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, গ্রামীণ জনপদ থেকে শহুরে কে›ন্দ্রস্থল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের শেষ দিন ছিল আজ। এদিন ফ্যাসিস্ট হাসিনার পলায়নে মুক্ত হয় দেশ। সূচনা হয় নতুন বাংলাদেশের। ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রæতই রূপ নেয় সর্বস্তরের জনগণের এক সম্মিলিত প্রতিবাদে। কর্মজীবী মানুষ, তরুণ-তরুণী, নারীরা, এমনকি প্রবীণরাও এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে এ আন্দোলনের শুরু। এক পর্যায়ে তা রূপ নেয় বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে। ছাত্রদের যৌক্তিক এ আন্দোলনে তৎকালীন স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালালে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় বইতে শুরু করে। ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর, এ আন্দোলনের চিত্রই যেন বদলে যায়। ছাত্র-জনতার ‘আমার ভাই মরল কেন, জবাব চাই’ ¯েøাগানে কেঁপে উঠেছিল সারা বাংলা। উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে শোবিজ অঙ্গনেও।
রাজপথ যখন শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত, তখন প্রতিবাদে সরব হন শোবিজ তারকারা। সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন তারা। শুধু তাই নয়, ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ’, বিক্ষুব্ধ থিয়েটারকর্মী, ‘গেট আপ, স্ট্যান্ড আপ’ ইত্যাদি ব্যানারে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে রাজপথে সরব ছিলেন শিল্পীরা। এসব ব্যানারে আন্দোলনের সময় রাজপথে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নেওয়া শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, শবনম বুবলী, তমা মির্জা, সাবিলা নূর, সাফা কবির, পারসা ইভানা, রুকাইয়া জাহান চমক, বিদ্যা সিনহা মিম, পুজা চেরী, সালহা খানম নাদিয়া, সাদিয়া আয়মান, জয়া আহসান, সাবিলা নূর, রাফিয়াত রশীদ মিথিলা, নাজিয়া হক অর্ষা, অভিনেতা মামুনুর রশীদ, মোশাররফ করিম, আশে খান, তৌসিফ মাহবুব, ইরেশ যাকের, নিলয় আলমগীর, মুশফিক আর ফারহান, সিয়াম আহমেদ, শ্যামল মাওলা, নির্মাতা নুরুল আলম আতিক, আকরাম খান, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, মাতিয়া বানু শুকু, রেদওয়ান রনি, আশফাক নিপুণ, আদনান আল রাজিব, সৈয়দ আহমেদ শওকির, মিশুক মনি, মাবরুর রশিদ বান্নাহ, গোলাম সোহরাব দোদুল, শিহাব শাহীন, খিজির হায়াত খান, মাহমুদ নিয়াজ চন্দ্রদীপ, সুমন আনোয়ার, গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী, গীতিকার ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদ, ইথুন বাবু, সংগীতশিল্পী পার্থ বড়ুয়া, আসিফ আকবর, শারমীন সুলতানা সুমি, ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান, জয় শাহরিয়ার, এ কে রাহুল, খৈয়াম শানু সন্ধি, কৃষ্ণকলি, মৌসুমী, পারসা মেহজাবিন পূর্ণি, তাসরিফ খান, লুৎফর হাসান, র‌্যাপার হান্নান হোসাইন শিমুল, র‌্যাপার সেজান ও ইনফ্লুয়েন্সার সালমান মুক্তাদির প্রমুখ।
এক কর্মসূচিতে দেশের শীর্ষ ব্যান্ডগুলোও রাজপথে পরিবাদের ঝড় তুলেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইলস, মাকসুদুল হক, আর্টসেল, শিরোনামহীন, চিরকুট, কুঁড়েঘর, মেকানিক্স, ক্রিপটিক ফেইথ, ওয়ারফেজ, এভয়েড রাফা, মেঘদল, সহজিয়া ইত্যাদি।
সামাজিক মাধ্যমেও তারকারা বেশ সরব ছিলেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম সবখানেই আওয়াজ তুলেছিলেন শিল্পীরা। আন্দোলন চলাকালীন তারকাদের দেওয়া ফেসবুক স্টেটাস- 
শবনম বুবলী (অভিনেত্রী) : শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরবে কেন? সিয়াম আহমেদ (অভিনেতা) : আমার ক্যাম্পাস রক্তাক্ত কেন? শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরবে কেন? তমা মির্জা (অভিনেত্রী) : কাদের আঘাত করছি? জাতির মেরুদন্ড ভেঙে ফেলে আমরা আগের মতো দাঁড়াতে পারব তো? পূজা চেরী (অভিনেত্রী) : এ কেমন স্বাধীনতা। এই স্বাধীন দেশে নারীদের প্রতি এ আচারণ মেনে নেওয়া যায় না। তীব্র নিন্দা জানাই। সালহা খানম নাদিয়া (অভিনেত্রী) : জীবনটা ফিরিয়ে দিতে পারবেন? সাদিয়া আয়মান (অভিনেত্রী) : আর কত রক্ত দিলে স্বাধীন হবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ? সালমান মুক্তাদির (ইনফ্লুয়েন্সার) : এমন কোনো ছাত্র আছেন, যিনি হামলার শিকার হয়েছেন অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঢুকতে পারছেন না? আমি তোমাদের খেয়াল রাখব। এ মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু করতে না পারার জন্য দুঃখিত। কারও যদি থাকার জায়গার প্রয়োজন হয় অথবা চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন হয়। আমি আছি।’ সাবিলা নূর (নির্মাতা ও অভিনেতা) : এত এত ছাত্রছাত্রী ভুল দাবি করতে পারে না। নিলয় আলমগীর (অভিনেতা) : আজকের ছাত্রছাত্রীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই একটা সময় দেশের হাল ধরবে। এত এত ছাত্রছাত্রী ভুল দাবি করতে পারে না। মাহমুদ নিয়াজ চন্দ্রদীপ (নির্মাতা) : আপনি সংস্কৃতিকর্মী? আপনি প্রগতিশীল? আপনি নিরীহ নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার বিরুদ্ধে একটা শব্দও উচ্চারণ করেছেন!’ খিজির হায়াত খান (নির্মাতা ও অভিনেতা) : লাঠিয়াল বাহিনী ছাত্রলীগকে আমাদের দেখিয়ে দেওয়ার জন্য এ দেশটা এই মুহূর্তে শুধু আওয়ামী লীগ আর ছাত্রলীগের। আপনাদের শিল্পকর্ম টাইম লাইনে থাকল। একদিন এ দেশটা আবার স্বাধীন হবে জেনে রাইখেন। শিহাব শাহীন (নির্মাতা) : একদিন না একদিন সবাই তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করিতে হইবে। গোলাম সোহরাব দোদুল (নির্মাতা) : তবুও আমি কেলাইতে থাকি। সারাক্ষণ নিজেকে বাঁচিয়ে চলি সুবিধাবাদী হয়ে। ভুল সব স্নেহে, ভালোবাসা, প্রেম নিয়ে একটা বানোয়াট জীবনের দিকে ধাবিত হই। মনে মনে পৈশাচিক শান্তি পাই। বলি, কোন মায়ের বুক খালি হইল, সেটা বুঝে আমি করবটা কী? আমার সন্তান তো বিদেশে থাকে। কী প্রশান্তি। মাবরুর রশিদ বান্নাহ (নির্মাতা) : ছাত্রদের চুপ করানো যদি সহজই হতো, তাহলে পৃথিবীর অনেক বিপ্লবই শুরুতে থেমে যেত। তাসরিফ খান (সংগীতশিল্পী) : মানুষ হয়ে মানুষ পেটান, সামান্য কী বুক কাঁপে না? অধিকার চাইল যারা, তারাই-বা কী খুব অচেনা? দলের চেয়ে না দেশটা বড়, তাহার চেয়েও বড় মানুষ, এতই অন্ধ হলাম কবে, ফিরবে কবে মোদেরই হুঁশ? একটুখানি জিরিয়ে ভাবুন, দোহাই একটু আস্তে মারুন, ভাইয়ের গায়ে, বোনের গায়ে আঘাত করতে হাত কাঁপে না? মানুষ হয়েই কী লাভ হলো, আজ মানুষ লাগে খুব অচেনা! রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত (নির্মাতা) : এরা বুক ফুলিয়ে যতই ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচাক, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪-র আজকের এই ছাত্রলীগের কোনো ধরনের সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। আজ এরা চেতনাহীন, পথভ্রষ্ট, অর্থলোভী পঙ্গপাল ছাড়া কিছুই নয়। শারমিন সুলতানা সুমি (সংগীতশিল্পী) : আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, আমাদের প্রজন্ম, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সবার নিরাপত্তা ও সুদিন; সদ্বিবেচনার সঙ্গে নিশ্চিত করার বিনীত অনুরোধ রইল।’ লুৎফর হাসান (সংগীতশিল্পী) : এক সময় যাদের সঙ্গে দেখা হলে ধন্য হতাম, যাদের ফেসবুকে যুক্ত থাকাটা গৌরবের ভাবতাম, যারা নাম ধরে ডাকলে আত্মহারা হতাম, যাদের সঙ্গে একটা ছবি থাকলে টাইমলাইনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেত, যাদের মনে করতাম আদর্শ, আজ দেখলাম সেসব শিল্পী, কবি, লেখক, নেতা, অভিনেতা, ক্রিকেটার, অধিকাংশই হিপোক্রেট, মানুষ হিসাবে একেবারেই তো যোগ্য নয়। তাদের গালি দিতেও ঘেন্না লাগে। মুশফিক আর ফারহান (অভিনেতা) : এই যে সন্তানসম ছাত্রদের লাঠিপেটা করছেন, বুকের কাছে এসে বিঁধিয়ে দিলেন বুলেট...। ঘুম আসে তো রাতে? কই আমরা তো ঘুমাতে পারছি না?’ রুকাইয়া জাহান চমক (অভিনেত্রী) : আমি সারারাত জেগে আছি। ঢাবি আর জাবিতে কি চলছে? কেউ কি আপডেট দিতে পারবেন? কাল সকাল পর্যন্ত আমার ফেসবুক থাকবে কিনা জানি না। তবে, কাল থেকে আমি রাস্তায় নামব আমার আন্দোলনকারী ভাইবোনদের সঙ্গে। মিশুক মনি (নির্মাতা) : এসব দৃশ্য শহরে হু হু করে হাঁহাকার নামায়। মুক্তিযোদ্ধার বিরোধিতা করা আর মুক্তিযুদ্ধ কোটার বিরোধিতা করা এক নয়। এই মুল্লুকে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে রাজাকার হয়ে যায়। সরকারের চেয়ারধারী কোনো কর্তার দুর্নীতি নিয়ে কথা বললে রাজাকার হয়ে যায়। দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামলে রাজাকার হয়ে যায়।’ বিদ্যা সিনহা মিম (অভিনেত্রী) : এই শহর আমার, এই মানুষগুলো আমার। তাদের চোখে জল থাকলে আমার ঘুম আসে না। জয়া আহসান (অভিনেত্রী) : নৈরাশ্য আমাকে শূন্যতার দিকহীন সুড়ঙ্গে ছুঁড়ে দিয়েছে। এত মৃত্যু, এত কান্না। যে জীবন গেছে তা আর ফিরে আসবে না। যে ক্ষত আমাদের মনে সৃষ্টি হলো তা অমোচনীয়। কেমন করে পথ চলব আমরা? অবিশ্বাস-অনাস্থা-ঘৃণার আবহে পথ হারিয়ে ফেলব কি আমরা! 

এছাড়া আরও অনেক শিল্পী প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন সামাজিক মাধ্যমে। রাজপথে শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত নিথর    দেহ তাদের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছিল রক্তক্ষরণ। তবে আন্দোলন যখন তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করে তখন শুরুতে প্রতিবাদকারী অনেক শিল্পীই পিছু হটেন। আবার ছাত্র-জনতা যখন একদফা দাবি ঘোষণা করে, তখনো কিছু শিল্পী ফেসবুকে স্টেটাস দিয়ে একদফার বিরোধিতা করেন। তবে কেউ কেউ একদফা দাবির পক্ষে সোচ্চার হয়ে জীবনের মায়া ত্যাগ করে মাঠেও নেমে পড়েন।