ছবি: গণবাংলা
স্বাধীনতার বয়স ৫৬ পেড়িয়েছে। বুড়ো হয়ে গেছি। অনেক দিন হলো চোখ কান গলার সমস্যায় ভুগছি। এর মাঝে পরপর দুইবার করোনা আক্রন্ত হয়ে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছি। ৫০ বছর ধরে ঘুম না হবার রোগে নির্ঘুম রাত কাটাই। কোনো গভীর রাতে তন্দ্রাচ্ছন্নে মৃত সহযোদ্ধ মোবারক আহমেদুল জলিল আরে কজনার আবছা মুখ চিৎকার করে বলছে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জীবন দিলাম। আমাদের রক্তে ভিজা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি। যুদ্ধের দিনগুলোতে শত্রæ প্রতিক্ষায় রাতজাগা এ্যমবুসে কল্পিত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, মানুষের হাসি মুখ। আর স্বাধীনতার প্রায় ৫১ বছরে কবরের গভীর অন্ধকারে শহীদের আত্মার চিৎকার শুনি। ওরা বলে যায় আমাদের রক্তের বাংলাদেশে সাম্য মানবিক মর্যাদা ন্যায় বিচার আইনের শাসন বাক ও ভোটের অধিকার কোথায়?
আমার তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেঁটে যায় ...
এইতো সেদিনের কথা কৈশোর তারুণ্যের লড়াকু যৌবন হাড়িয়ে বয়স সত্ত্বর ছুঁয়েছে। সহযোদ্ধাদের অনেকেই পরপারে। বাকিরা বৃদ্ধ জরাজীর্ণ। জীবনের সাথে ঔষধ পথ্য নিত্যসঙ্গী করে বেঁচে থাকার অসহায় প্রচেষ্টা। আর কয়দিনই বা জোর কয়েক বছর! তারপর স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা নিয়ে নাই হয়ে যাবে রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা।
আর বেঁচে থাকবে নকল ভূয়ারা। ঐ সমস্ত বেহায়া বেলাজ তস্কর যারা মুক্তিযুদ্ধে নূন্যতম অবদান না রেখেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিখিয়েছে। এদের মাঝে আছে মন্ত্রী, আমলা, এমপি, রাজনীতিবিদ টাউট বাটপার এমনকি রাজাকার আলবদর। প্রমাণসহ শত অভিযোগ অনুযোগ জানিয়েও কিছু হয়নি। মন্ত্রণালয় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) রুটিন ওয়ার্ক নিয়ে সদা ব্যাস্ত। প্রায় প্রতি মাসে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা স্ফীত হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর অতি কথন দেশবাসীর কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা হয়েছেন বিব্রত।
সরকার প্রধানের দুঃখ জনক নিরবতা মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যথিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর সময় তিনি প্রকৃত মুক্তযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণ করলেও বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচ্ছন্ন নির্ভুল তালিকা হোক কোন সরকার আন্তরিক ভাবে চায়নি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের দাবিদার আওয়ামী সরকারের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।
আর কার কাছে অভিযোগ জানাবে মুক্তিযোদ্ধারা। বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই। আছে বঙ্গবন্ধু নাম নিয়ে ব্যবসা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাজ বাদ্যকর। যারা বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে অবাধ লুন্ঠনের স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে বাংলাদেশ।
দুঃখবোধ থেকে যাবে - মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা হৃদয়ের বিশালতায় স্বাধীনতার অহংকারে সমগ্র জাতিকে গৌরবান্বিত করতে চেয়েও পারেননি।
অথচ স্বাধীনতার পরপরই জন্ম নেয়া লুটেরা তস্কর লুটে নিল মুক্তিযোদ্ধাদের শৈয্য বীর্য অহংকার। কালিমা লেপন করে দিল মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের কপালে কলংক তিলক।
জীবনের শেষ বেলায় বেদনাবোধ জর্জরিত করে। নষ্ট দেশ নষ্ট সমাজ নষ্ট মানুষের জন্য মুক্তযোদ্ধারা যুদ্ধ করেননি। ত্রিশ লক্ষ মানুষ অকাতরে জীবন দেননি। মা বোনরা সম্ভ্রম হারাননি।
জীবন সায়াহ্নে তোমাদের বলছি হাঁ তোমাদের কেই বলছি- অসৎ রাজনীতিবিদ আমলা, ধনিক বনিক বুদ্ধিবেশ্যা লুটেরা মাফিয়া গোষ্ঠী, মনে রেখো ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। তোমরাও ক্ষমা পাবেনা। ইতিহাসের অনিবার্য পরিনতি অপেক্ষামান।
আমাদের দুভার্গ্য! নয় মাসেরও কম সময়ে আমারা স্বাধীনতা নিয়ে নতুন দেশ বাংলাদেশ পেয়েছি। নতুন পতাকা পেয়েছি।
জাতিগত নিপীড়ন থেকে মুক্তির সার্বিক লড়াই এগিয়ে নেবার পূর্বেই বিজয়ের চুড়ান্ত উল্লাসে মেতে উঠেছে বাংলাদেশ। অধরাই থেকে গেছে মুক্তির কাঙ্খিত স্বপ্ন।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এলেন। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্র করে শুন্য হাতে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের অস্ত্র আর বিশ্বাস সমর্পণ করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে।
সল্প সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রচিত সংবিধানের কোথাও সন্নিবেশিত হয়নি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দ। এমন কি বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ জনযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসও স্থান পায়নি।
সময় ফুরিয়ে আসছে। আমাদের কথা আমাদেরকেই বলতে হবে। অনেক বলার আছে। জানি এ সব শোনার শ্রোতা নাই তবুও বলে যাবো। বলতে হবে এবং প্রজন্মকে জানতে হবে। বাংলাদেশ জন্মের সাথে পূর্ব পুরুষের ইতিহাস। মাঠ ঘাটের চাষাভুষা কারখানার শ্রমিক লাঙ্গল ঠেলা কৃষক। স্কুল পড়ুয়া কৈশোর তরুণ। সদ্য যৌবনের ছোঁয়া পাওয়া দ্রোহের আগুনে ফুসে উঠা মুক্তযোদ্ধাদের কথা।
আজ থাক। বেঁচে থাকলে আর একদিন না বলা কথা গুছিয়ে বলতে না পারলেও এলোমেলো ভাবেই বলবো ..... ।
ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।













