ঢাকা,  মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬,

নববর্ষে নবযাত্রা

নিবন্ধ

অধ্যাপক ডাঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সিকদার

প্রকাশিত: ১২:৪৩, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট: ১২:৪৫, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

নববর্ষে নবযাত্রা

ছবি: সংগৃহিত

পহেলা বৈশাখ বাংলা বর্ষের প্রথম দিন। এই দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার গ্রাম-শহরে ঐতিহ্য গত আনুষ্ঠানিকতার সাথে উৎসবমুখর পরিবেশ উদযাপিত হয় এটি বাঙালির একটি সার্বজনীন, জাতীয় উৎসব। এদিন স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালতসবকিছুই থাকে ছুটিতে। সারা দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ দিনটিকে আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেয়। অতীতের সমস্ত ব্যর্থতা, গ্লানি অকল্যাণকর উপাদানগুলোকে ধুয়ে-মুছে, আগামী দিনের নবযাত্রাকে কল্যাণ, আনন্দ, সত্য, ন্যায় সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য মানুষ দিনটিকে উদযাপন করে।

নববর্ষের উৎসবটি জাকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। বৈশাখের প্রথম সূর্যোদয়ে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় আলকিত হয়। নব সূর্যোদয়ের আলোতে উদ্ভাসিত বাংলার বর্ণিল প্রকৃতিকে বরণ করতে উদ্গ্রীব থাকে মানুষ। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জে, এই পহেলা বৈশাখ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঐতিহ্যগতভাবে পালিত হয়ে আসছে।

 মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলাদেশে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসল কাটার পরেপহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিক ভাবে নববর্ষ পালন শুরু করা হয়েছে। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট  জমিদাররা বৎসর শেষে খাজনা আদায়ের জন্য একটি পুণ্যাহ প্রথার ব্যবস্থা করতেন। এটি আসলে খাজনা আদায়ের একটি পদ্ধতি, যেখানে একটি উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। তবে জমিদারি প্রথা বা রাজাদের প্রভাব কমে যাওয়ার পর সেই পুণ্যাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এখনও হালখাতা বা বাৎসরিক হিসেব নিকাশের বহু অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৈসাবি মেলা বা বৈসাবি উৎসব তাদের ঐতিহ্যগত অনুষ্ঠানের অন্যতম উদাহরণ। গ্রামেগঞ্জে নববর্ষের অনুষ্ঠান বিভিন্ন মেলার মাধ্যমে উদযাপিত হয়। আমরা দেখিঘুরি উড়ানো, খেলনা, পুতুল, তৈজসপত্র, মাটির বিভিন্ন সামগ্রি বিক্রয়, ঐতিহ্যগত খেলাধুলা, গান, বাজনা, নৃত্যসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা এখনো পালিত হচ্ছে। কালের বিবর্তনে শহরাঞ্চলে এটি আধুনিক পরিমণ্ডলে, শহরের সাংস্কৃতিক উপাদান মিশ্রিত নতুন আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। কিন্তু শহর বা গ্রাম হোক, আবহমানকালের বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা সবসময় শ্রদ্ধাভরে লালিত হয়েছে। এটি প্রকৃতিগত বাঙালির সহজাত স্বভাবের ফসল, কোনো কৃত্রিম সাংস্কৃতিক চর্চার বিষয় নয়।

বাংলাদেশের প্রকৃতির ঐশ্বর্য, শ্যামল মাঠ, ফসলের ক্ষেত, পশুপাখি-সমৃদ্ধ গ্রামীণ জীবন এবং শহরের আধুনিক মানুষের বিনোদনসবকিছুর সন্নিবেশ আমরা এই উৎসবে দেখতে পাই। ঢাকা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর অঞ্চলে এটি পালিত হয়। ঢাকা শহরের রমনা বটমুলের ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান বাংলার নববর্ষকে স্বাগত জানায়। এটি পাকিস্তানের আমল থেকে শুরু হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও পালিত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মঙ্গল শোভাযাত্রা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। এতে শুধু চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র-শিক্ষক নয়, ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষও অংশ নেন। এই আনন্দঘন, উদার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষের কল্যাণ, শিল্প নববর্ষের আবেদন একসাথে মিশ্রিত হয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের ঐক্যের প্রতীক।

বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে সংকটে পড়েছেপ্রাকৃতিক দুর্যোগ,অর্থনৈতিক সংকট দেশের আভ্যন্তরীণ   আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপের সংকট;। তবুও বাঙালি তার সাংস্কৃতিক চেতনা, উদার জাতীয়তাবাদ এবং সম্ভাবনাময় শক্তি কখনো ভুলে যায়নি। বরং সংকট উত্তরণ ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য তারা বাঙালির দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চেতনাকে লালন করেছত; নবসংযোজনের মাধ্যমে মানুষ অকল্যাণ, মিথ্যা, জবরদস্তি, অসত্য, জুলুম, লুটতরাজ দুর্বৃত্তপনা থেকে - সুকুমার চিন্তা, কল্যাণ ন্যায়ের পথে এগিয়ে গিয়েছে।

বাংলার মানুষ সব সময় এই ঐতিহ্য অনুষ্ঠানকে স্মরণ করে এবং চর্চা করে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ বাঙালির আত্মদান এবং ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস প্রমাণ করে, বাঙালির ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক চেতনায় সমৃদ্ধ জাতীয়তাবাদই মূল শক্তি।আজকের বাংলাদেশ যে সম্ভাবনাময় দেশ, সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে অতীতের অর্জন ঐতিহ্যকে স্মরণ চর্চা করতে হবে। ভাষা সংস্কৃতিকে ধারণ করে বাঙালি এগিয়ে যাবে। কারণ বাঙালি অতীতে কখনো অন্যায়, মিথ্যা বা কূপমন্ডুকতার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। তারা দেশকে, ভাষা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধাভরে লালন করে ও ভা্লোবাসে।

বিশ্বাস করি, ১৪৩৩ সালের এই নববর্ষে বাংলাদেশ দুর্নীতি মিথ্যা ও কূপমণ্ডূকটা থেকে বেরিয়ে উদার জাতীয়তাবাদী,গনতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ধারায় এক নবযাত্রার সূচনা করবে যেখানে মানুষ উন্নত সমৃদ্ধ অগ্রসরমান জীবন পাবে।

অধ্যাপক ডাঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সিকদার

সাবেক উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়