ছবি: গণবাংলা
স্বাধীনতা একটি জাতির সর্বোচ্চ অর্জন। এটি শুধু একটি ভূখন্ডের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নাম নয়; বরং একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি স্বাধীনতার আকাঙ্খা বিসর্জন দিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে চায়নি। স্বাধীনতা কখনো দয়ার দান নয়, বরং ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাও সেই চিরন্তন সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ।
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই বিজয় ছিল না কোনো আকস্মিক ঘটনা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতির উপহার। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায়ের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতির অনিবার্য পরিণতি। এক সাগর রক্ত, অসংখ্য মা-বোনের আত্মত্যাগ এবং লাখো মানুষের সীমাহীন কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা বাংলাদেশের জাতীয় সত্তার ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
একসময় বাঙালিকে দুর্বল ও ভীরু জাতি বলে অবজ্ঞা করা হতো। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, এই জাতি প্রয়োজন হলে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় জীবন দিতেও পিছপা হয় না। স্বাধীনতার জন্য যেমন যুদ্ধ করতে হয়েছে, তেমনি স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামও বারবার সামনে এসেছে। কারণ স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা সংরক্ষণ করা অনেক বেশি কঠিন। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিংবা বহিরাগত নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার মূল চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে। তাই স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতিকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, বৈষম্য ও জনঅসন্তোষের বিরুদ্ধে জনগণের শক্তিশালী অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনকে ঘিরে সমাজে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ একে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, আবার কেউ এই পরিভাষাকে ইতিহাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। বাস্তবে স্বাধীনতা ও সরকার পরিবর্তন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ধারণা। স্বাধীনতা অর্জিত হয় বিদেশি শাসন বা দখলদারিত্বের অবসানের মাধ্যমে। অন্যদিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন কিংবা স্বৈরতন্ত্রের পতন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অংশ। তাই দুটি বিষয়কে একই অর্থে ব্যবহার করলে ইতিহাসের মৌলিক পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার ধারণা একদিনে গড়ে ওঠেনি। ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা বিপর্যস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। প্রায় দুই শতকের সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও পূর্ববাংলার মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বৈষম্যের কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরেই নতুন সংকটের জন্ম হয়। শেষ পর্যন্ত সেই বৈষম্যের অবসান ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, কেবল ধর্মের ভিত্তিতে একটি টেকসই জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন ভৌগোলিক সংযোগ, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য, অভিন্ন রাজনৈতিক আকাঙ্খা এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থা। বাংলাদেশের জন্ম সেই বাস্তবতারই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
স্বাধীনতার পরও দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সব সময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণের পথ কখনোই সহিংসতা নয়; বরং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে, জনগণ যখন ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন পরিবর্তনের শক্তিশালী সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তবে সেই অর্জনকে যথাযথ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা জরুরি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ, আর পরবর্তী গণআন্দোলনগুলো ছিল সেই রাষ্ট্রের ভেতরে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার সুসংহত করার সংগ্রাম।
বাংলাদেশের ইতিহাসকে প্রতিযোগিতার নয়, ধারাবাহিকতার ইতিহাস হিসেবে দেখা প্রয়োজন। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ খুলেছে। আর সাম্প্রতিক গণআন্দোলনগুলো জনগণের অধিকার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবিকে আরও জোরালো করেছে। প্রতিটি আন্দোলনের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু একটির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটির ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে খাটো করার কোনো সুযোগ নেই।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। এই চেতনা কেবল অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের পথনির্দেশনাও। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, বৈষম্যহীন সমাজ এবং আইনের শাসন এই মূল্যবোধগুলোই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শিক্ষা। সেই আদর্শকে ধারণ করেই বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ইতিহাসের প্রতিটি সংগ্রাম তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা জাতির ঐক্য, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র নির্মাণে অবদান রাখবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাজীর বেলাল
যুগ্ম মহাসচি, ফ্রিডম ফাইটার্স কাউন্সিল













