ঢাকা,  শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬,

গণঅভ্যুত্থান ও বাংলাদেশ

গণঅভ্যুত্থান ও বাংলাদেশ

ছবি: গণবাংলা

 

৫ আগস্ট ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে।
বিশ্বে অনেক স্বৈরাচারী শাসকের জন্ম হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার মতো এমন জঘন্য মহিলা স্বৈরাচারী শাসক একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার লালসায় একজন মানুষ কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে হাসিনা। 
ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারি হাসিনা যখন-তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে, বিশেষ করে হাসিনার সময়।
মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের দু’টি চেতনা ছিল। প্রথমত, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা এবং দ্বিতীয়ত, সমাজে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করা। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশের নির্বাচনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আর দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকর করে ফেলা হয়।
অন্তর্র্বতী সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। বিগত সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল উন্নয়নের নামে অর্থ লোপাট করে তা পাচার করা।
১৯৯৬ সালে সম্মিলিত বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে যে চারটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার সবগুলোই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বীকৃতি অর্জন করে।
কিন্তু ২০০৮ সালে সেনাশাসিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকেই শেখ হাসিনা তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বাতিল করার জন্য উদ্যোগী হন। পরে সরকারের অনুগত বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে দ্বিধাবিভক্ত বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয়। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই জাতীয় সংসদে বিল পাশের মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়।
তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। জাতি নিমজ্জিত হয় হতাশার সাগরে। তিনি ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখতেন। তার দলেও কেউ কেউ বলতেন, আগামী ১০০ বছরেও আওয়ামী লীগকে কেউ ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবে না।
আওয়ামী লীগ সব সময়ই সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভয় পায়। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে নির্বাচনের নামে প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে তিনটি নির্বাচন কোনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। একটা মানুষ ক্ষমতার জন্য কতটা নির্লজ্জ এবং নির্মম হতে পারে, হাসিনা তার বাস্তব প্রমাণ রেখে গেছেন।
২৪-এর জুলাই মাসে শিক্ষার্থীরা যখন সরকারি চাকরিতে কোটা সুবিধা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, তখন শেখ হাসিনা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের ঘৃণ্য পন্থা অবলম্বন করেন।
আন্দোলনকারীদের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করতে থাকেন। শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা মানুষ হত্যা করে। এমনকি হেলিকপ্টার থেকে গুলি বর্ষণ করে শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এভাবে আন্দোলন দমনের চেষ্টার কোনো নজির নেই।
কিন্তু সরকারের দমননীতির ফলে আন্দোলনকারীরা আরও বেশি মাত্রায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বর্ষিত হয় আন্দোলনকারীদের প্রতি। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা দাবিতে পরিণত হয় এবং দলমত নির্বিশেষে সব মানুষ আন্দোলনে সামিল হয়।
শেখ হাসিনা কথায় কথায় বলতেন, ‘হাসিনা পালায় না।’ কিন্তু তার সেই অহংবোধ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। এক পর্যায়ে জীবন বাঁচানোর জন্য শেখ হাসিনা তার বোনসহ ভারতে পালাতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার মতো নির্মম-নিষ্ঠুর স্বৈরাচারের যেমন জন্ম হয়নি, তেমনি তার মতো রাজ্যহারা হয়ে কাউকে পালিয়ে যেতে হয়নি।
কোনো দেশের সরকার যখন হৃদয়হীন ও গণবিরোধী হয়ে উঠে হীন স্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে, তখন গণবিস্ফোরণ ঘটে। ২৪’এর জুলাই-আগস্টে আমরা সেই বিষয়টিই প্রত্যক্ষ করি। পদে পদে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তাই তারা আন্তরিকভাবে শেখ হাসিনার পতন কামনা করেছিল। শিক্ষার্থীদের আত্ম-উৎসর্গকারী আন্দোলন সফলতা অর্জন করে। বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করে।
আওয়ামী লীগের হাতে দেশের মানুষের অধিকার এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিরাপদ নয়, এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সব দল বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান পারিবারিক শাসন কায়েমের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার মেয়ে হাসিনা তার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে তাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন।
একজন নারী যে কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হতে পারে তা শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকাল প্রত্যক্ষ করলেই অনুধাবন করা যায়। গণআকাঙ্খার বিরুদ্ধে গিয়ে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসন কায়েমের পরিণতি কী হতে পারে শেখ হাসিনা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন।
গণঅভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল সব ধরনের বৈষম্য নিরসন করা। বৈষম্য নিরসন করতে হলে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যারা গণ-আকাঙ্খার প্রতি আন্তরিক এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম।
কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাংলাদেশের জন্য তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থাই একমাত্র পথ, যা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। এ মুহূর্তে তত্ত¡াবধায়ক ব্যবস্থার উপযুক্ত বিকল্প গ্রহণযোগ্য কোনো পদ্ধতি আমাদের সামনে নেই।
তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সরকারের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা কম থাকে। কারণ কোনো সরকার যদি জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে দলটির বিজয়ী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
প্রত্যেকবার গণআন্দোলনের মুখে সরকার পরিবর্তিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। এবারও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ২৪-এ যে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন ঘটে, তার প্রেক্ষাপট এবং ধরন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। আর সে কারণেই মানুষের মনে সৃষ্ট আকাঙ্খাও অত্যন্ত দৃঢ়। তারা মনে করছেন, এবার নিশ্চয়ই তাদের হতাশ হতে হবে না; প্রত্যাশা পূরণ হবে।
২৪’এর ছাত্র-জনতার সফল গণআন্দোলনের মাধ্যমে দেশে এক ধরনের পুনর্জাগরণ (রেনেসাঁ) সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্ট রেনেসাঁর লক্ষণ আগেই ফুটে উঠেছিল। জুলাই গণআন্দোলনের প্রায় ছয় মাস আগেই আমি এদেশে রেনেসাঁ ঘটতে যাচ্ছে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলাম।
অন্তর্র্বতী সরকার তার দেড় বছর মেয়াদে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি অর্জন করতে পারেনি। পারেনি কোনো মৌলিক পরিবর্তন সাধন করতে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য অর্জিত হলেও তা জনপ্রত্যাশা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তা স্বাভাবিক বলে মনে করার কোনো কারণ ছিল না। এর পেছনে পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের ইন্ধন ছিল। পুলিশের যে সব সদস্য দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ অথবা গাফিলতি করছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি । তারেক রহমানের সরকারের সময়ও এমন ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলের সাড়ে ১৫ বছর সময়কালে ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।
যারা বিগত সরকারের বিশেষ আনুকূলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি অর্জন করেছেন, তারা বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছেন। 
প্রচন্ড দৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রবল পরাক্রমশালী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। ছাত্র-জনতা রাজপথে জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেছে। তাদের সেই অবদান কোনোভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।
কিন্তু তাই বলে আন্দোলনের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। সম্মিলিত উদ্যোগেই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, গত এক বছরে তা অনেকটাই ¤øান হয়ে গেছে। বিশেষ করে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ ও বক্তব্যের কারণে সৃষ্ট ঐক্য অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে। আমরা যদি ঐক্য ধরে রাখতে না পারি, তাহলে তার বেনিফিশিয়ারি হবে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা।
শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেই দেশত্যাগ করেছেন। অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। কিন্তু তাই বলে তাদের অশুভ তৎপরতা বন্ধ হয়ে যাবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
আওয়ামী লীগ সেই রাজনৈতিক দল, যারা ধ্বংসাত্মক কাজ করে তার দায়ভার সুকৌশলে অন্যের ওপর চাপাতে অত্যন্ত দক্ষ। তাই সতর্কতার সঙ্গে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মাধ্যমে যে ঐক্য গড়ে উঠেছে, তাকে ধরে রাখতে হবে। কোনোভাবেই সেই ঐক্য নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। সমন্বয়ক এবং সরকারের কোনো কোনো অংশীজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অনির্বাচিত সরকার দীর্ঘায়িত হলে এ ধরনের অভিযোগ আসতেই থাকবে। 
সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং চলমান প্রক্রিয়া। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সব সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে এটা ভাবা ঠিক নয়। আমাদের এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যেন আর কোনো স্বৈরাচারী সরকারের কবলে না পড়ে। 

অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত