ছবি: গণবাংলা
একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতিতে যে দ্ব›দ্বটি বিশ্বশান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে, তা হলো ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে শুরু করে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন—প্রতিটি পদক্ষেপে এই দুই দেশ গত অন্তত পাঁচ দশক ধরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এই উত্তেজনা নতুন করে চরম সীমায় পৌঁছেছে, যেখানে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ড্রোন যুদ্ধের তীব্রতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই শত্রæতার শিকড় জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৫০-এর দশকে। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক যখন দেশটির তেল সম্পদ জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেন, তখন ব্রিটিশরা তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স এবং মার্কিন সিআইএ যৌথভাবে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করে। ১৯৫৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করা হয়। এই ঘটনাটিকে ইরানের শিক্ষিত সমাজ গণতন্ত্রের পথে একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখে, যা আজও ইরানিদের মনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসের স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাহের পতন ঘটে। এই বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ছাত্ররা ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে, যা টানা ৪শ ৪৪ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সময় জিম্মিদের মুক্তি মিললেও সম্পর্কের শীতলতা কাটেনি।
১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষতার দাবি করলেও গোপনে ইরাককে সমর্থন জোগায়। ১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে মার্কিন জাহাজ 'স্যামুয়েল বি রবার্টস' বোমা হামলার শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্রেয়িং মেন্টিস পরিচালনা করে ইরানের দুটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। সেই বছরের ৩ জুলাই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষিপ্ত মিসাইলে ২৯০ জন যাত্রীসহ ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়, যাকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভুলবশত হামলা’ বলে দাবি করে।
২০০২ সালে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির খবর জানাজানি হলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বিচলিত হয়ে পড়ে। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডবিøউ বুশ ইরানকে ‘দুষ্টতার অক্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক অবরোধ আরও কঠোর করা হয়, যা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। অবশেষে ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় ইরান একটি দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রæতি দেওয়া হয়।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি বাতিল করেন এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করেন। এই উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, যখন ট্রাম্পের নির্দেশে বাগদাদে ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতা জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়। এর জবাবে ইরান ইরাকে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা দুই দেশকে সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।
বর্তমান ২০২৬ সালের জুলাই মাসের পরিস্থিতি এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্প্রতি ইরানে নতুন করে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে, যার জবাবে তেহরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। হোয়াইট হাউস দাবি করছে, ইরান যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় নিচ্ছে। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হুংকার দিয়েছেন যে, ইরান কোনো হুমকি বা চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
বর্তমান সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, তারা এই প্রণালিটি সব ধরনের জাহাজের জন্য বন্ধ করে দিচ্ছে এবং এরই মধ্যে দুটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির সংকটে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর মারাত্মক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা বা সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবরের পরপরই তেলের দাম দ্রæত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাস্প্রতিক ২০২৬ সালের জুন-জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ায় সকালের বাজারেই তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৫ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। অন্য এক দিনে এই দাম একলাফে ৮ শতাংশ বেড়ে ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে অধিকাংশ বেসামরিক জাহাজের জন্য বন্ধ থাকে, তবে বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত ধীরে ধীরে কমে আসবে। এর ফলে বিশেষ করে শীতকালে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানি হিসেবে নয়, বরং তেলনির্ভর অন্যান্য পণ্য যেমন ডিজেল ও সারের দামও বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে, যা বিশ্বজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বর্তমানে বাজার যেভাবে অস্থিতিশীল হয়ে আছে, তার তুলনায় একটি নির্দিষ্ট ও পূর্বানুমানযোগ্য 'সেবামূল্য' অনেক দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। যেমন পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো যদি নিরাপত্তার বিনিময়ে প্রতি ব্যারেলে প্রায় দুই ডলার অতিরিক্ত খরচ বা সেবামূল্য ধার্য করে, তবে তা বর্তমানের ব্যাপক অস্থিরতার চেয়ে কম ক্ষতিকর হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হওয়ায় এর সংকট কেবল তেলের দামেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি বিশ্ববাণিজ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
সামগ্রিকভাবে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যেকোনো চেষ্টা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তোলে, যার ফলে তেলের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামাতে পারে।
এই ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণে কূটনীতির পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়নি। ওমান ও ইরানের মধ্যে উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ওমান একটি মধ্যপন্থার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে সরাসরি কর আরোপ না করে নিরাপত্তা ও উদ্ধারের মতো সামুদ্রিক সেবার বিনিময়ে জাহাজগুলো থেকে অর্থ আদায় করা হতে পারে। এছাড়া মালাক্কা প্রণালির মতো একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তুাবও আলোচিত হচ্ছে, যা যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এই যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ইরাননীতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ট্রাম্পের ওপর জনসমর্থন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ডোভার বিমানঘাঁটিতে নিহত মার্কিন সেনার মরদেহ ফিরে আসার দৃশ্য সাধারণ মার্কিনিদের মধ্যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন আর কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব অর্থনীতির স্থায়িত্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে হামলা বাড়িয়েও ইরানকে নতি স্বীকার করানো যাচ্ছে না, আবার যুদ্ধ বন্ধ করতে গেলেও কৌশলী ও অস্বস্তিকর ছাড় দিতে হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য এক গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে এবং যুদ্ধবিরতি এখন কেবল নামেমাত্র টিকে আছে। শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক কোনো একটি আপস সমঝোতাই হয়তো এই ধ্বংসাত্মক চক্র থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ হতে পারে, তবে তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ধৈর্য।













