ঢাকা,  শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬,

বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক

হাজার বছরের বিবর্তন থেকে স্মার্ট প্রযুক্তির আগামীর পথে

হাজার বছরের বিবর্তন থেকে স্মার্ট প্রযুক্তির আগামীর পথে

ছবি: গণবাংলা

বাংলাদেশ একটি চিরন্তন কৃষিনির্ভর দেশ। এই ভূখন্ডের মাটি, জলবায়ু এবং মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এ দেশের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। যদিও সময়ের আবর্তনে শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটেছে, তবুও বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কৃষি আজও তার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। হাজার বছরের পুরনো লাঙল-জোয়ালের চিরায়ত দৃশ্যপট পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ প্রবেশ করেছে ড্রোন, সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘স্মার্ট কৃষি’র যুগে।
বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত কৃষিরই ইতিহাস। আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার বছর আগে এই বদ্বীপে ধান চাষের মাধ্যমে স্থায়ী বসতির সূচনা হয়। মৌর্য, গুপ্ত ও পাল আমল থেকে শুরু করে সুলতানি আমল পর্যন্ত এ অঞ্চলে নদীভিত্তিক সেচব্যবস্থা এবং কৃষি অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। 
মুঘল শাসনামলকে বাংলার কৃষির ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। সে সময় এ দেশে উন্নত মানের ধান, পাট, তুলা, নীল ও আখ উৎপাদিত হতো এবং কৃষি সমৃদ্ধির খবর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ব্রিটিশ শাসনের ১৭৫৭ সালের পর বাণিজ্যিক স্বার্থে খাদ্যশস্যের বদলে নীল, চা ও তামাকের মতো অর্থকরী ফসল চাষে কৃষকদের বাধ্য করা হয়, যা কৃষকদের ঋণের জালে ফেলে দেয়। ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিন্তান আমলে কৃষি খাত অবহেলিত থাকলেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে ‘সবুজ বিপ্লব’-এর ফলে উচ্চফলনশীল জাতের বীজ, সার ও সেচ প্রযুক্তির ব্যবহারে ধানের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। 
বর্তমান যুগে কৃষি কেবল শ্রমনির্ভর কোনো কাজ নয়; বরং এটি এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক সমন্বিত রূপ। আধুনিক কৃষি বলতে এমন এক চাষাবাদ পদ্ধতিকে বোঝায় যেখানে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি এবং যান্ত্রিক শক্তি ব্যবহার করা হয়। 
যেখানে আগে শত শ্রমিক লাগত, এখন কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও পাওয়ার টিলার দিয়ে কয়েক ঘণ্টায় সেই কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। ধান রোপণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার এবং বীজ বপনের জন্য সীড ড্রিল ব্যবহার উৎপাদন খরচ ও সময় কমিয়ে দিচ্ছে। একই জমিতে ধান চাষের সঙ্গে মাছ চাষ বা হাঁস পালন করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া মাটি ছাড়া পুষ্টিকর পানি ব্যবহার করে ‘হাইড্রোপনিক্স’ এবং অল্প জায়গায় ধাপবিশিষ্ট স্তরে ‘ভার্টিক্যাল ফার্মিং’ বা উল্লম্ব কৃষি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, যা বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। ড্রোন এবং সেন্সর ব্যবহার করে জমির সঠিক চাহিদা অনুযায়ী সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। স্যাটেলাইট ইমেজিং এবং স্মার্ট সেন্সর মাটির আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার তথ্য সরাসরি কৃষকের স্মার্টফোনে পৌঁছে দিচ্ছে। ‘স্মার্ট কৃষক’, ‘কৃষকের জানালা’ এবং ‘এগ্রি এসিস্ট’ এর মতো মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা ঘরে বসেই ফসলের রোগ নির্ণয়, সার প্রয়োগের পরামর্শ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাচ্ছেন। এছাড়া সরকারের ১৬১২৩ হেল্পলাইনের মাধ্যমে সরাসরি কৃষিবিদদের পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
প্রযুক্তির জোয়ার আসলেও বাংলাদেশের কৃষকরা আজও নানা দিক থেকে সুবিধাবঞ্চিত। কৃষকরাই এ দেশের উন্নয়নের মূল কারিগর হলেও সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তারা প্রায়ই অবহেলিত থেকে যান তারা অত্যন্ত অসংগঠিত হওয়ায় কোনো ক্ষতি হলে বা ন্যায্যমূল্য না পেলে কেবল হতাশায় ভোগেন, কিন্তু সংগঠিত কোনো দাবি তুলতে পারেন না।

কৃষকের সবচেয়ে বড় সংকটের নাম হলো ‘ন্যায্যমূল্যের অভাব’। বিশেষ করে পচনশীল শাকসবজি ও ফলের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এতই বেশি যে, ভোক্তা উচ্চমূল্যে পণ্য কিনলেও কৃষক তার হাড়ভাঙা খাটুনির উপযুক্ত দাম পান না। অনেক সময় রাগে ও অভিমানে কৃষকদের রাস্তায় সবজি ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। এই ‘দুর্ভাগ্যের দুষ্টচক্র’ থেকে বের হতে হলে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ এবং সরাসরি আইসিটি ভিত্তিক ক্রয়-বিক্রয় ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
বর্তমান বাংলাদেশের কৃষি আজ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। দ্রæত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতি বছর আশঙ্কাজনক হারে কমছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা ও খরা কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির উচ্চমূল্য এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক প্রান্তিক কৃষক আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারছেন না। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে চাষাবাদের মৌসুমে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে, যা যান্ত্রিকীকরণের প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে ‘স্মার্ট কৃষি’র দেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে জলবায়ু-সহনশীল ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) ও কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) এ লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। 
ভবিষ্যৎ কৃষি হবে রপ্তানিমুখী এবং বাজারনির্ভর। ভর্তুকিনির্ভর কৃষিকে ব্যবসায়িক কৃষিতে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে কৃষকরা কেবল উৎপাদনকারী নয়, বরং সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠবেন। এ জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও যন্ত্রপাতি বিতরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষক, প্রযুক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত এই তিনের সমন্বয়ই বাংলাদেশের কৃষিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কৃষি কেবল খাদ্যের জোগান দেয় না, এটি একটি জাতির প্রাণ ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি। আজকের কৃষক কেবল লাঙল হাতে কাদামাটিতে নয়, বরং স্মার্টফোন ও ড্রোনের মাধ্যমে পৃথিবীকে জয় করার স্বপ্ন দেখছেন। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ ভোক্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় যদি কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা যায়, তবে বাংলাদেশ কেবল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই থাকবে না, বরং বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। ‘মাটি থেকে প্রযুক্তি’র এই সেতুবন্ধনই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূলমন্ত্র।