ঢাকা,  শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬,

খুন, চাঁদাবাজিসহ ১৫ মামলার আসামি

সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আগেই আটক সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

সারাবাংলা

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশিত: ১২:১১, ৩০ জুলাই ২০২৬

সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আগেই আটক সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

ছবি: সংগৃহীত

দেড় বছর ধরে চট্টগ্রামে জোড়া খুন থেকে চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি করা থেকে কলোনিতে ঢুকে বীরদর্পে খুন, হুমকি, ফোনের পর টাকা না পেলে হামলা-ভাঙচুরের মতো ফিল্মি স্টাইলে চট্টগ্রামে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেন। তাঁর একের পর এক ডায়ালগ ভাইরাল হয়েছে। কখনও ‘একটি খুন করলে যে সাজা, ১০টি খুন করলেও সেই সাজা’, ‘তোর পুরো শরীরে এমনভাবে গুলি করা হবে, পরিবার গণনাও করতে পারবে না’, ‘পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞাসা করিস, আমি কে জানতে পারবি’। এভাবেই গ্রামের একজন সাধারণ তরুণ ধীরে ধীরে বনে যান দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর হুমকি, ফোনে তটস্থ থাকতেন চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীরা। ঘোষণা দিয়েই ব্যবসায়ীর বাড়ি, দোকান ও নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ছিল তাদের কাছে মামুলি ঘটনা। 

দুবাই বসে একের পর এক অপকর্ম করলেও সম্প্রতি ভারতে আসেন তিনি। সেখান থেকে দেশে প্রবেশ করেন চার দিন আগে। সেই তথ্য চলে যায় পুলিশের কাছে। পুলিশ দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নেয়। সেই আভাস পেয়ে ফের ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে পুলিশের জালে আটকে গ্রেপ্তার হন ডেভিড ইমন। গত মঙ্গলবার রাতে যশোরের কোতোয়ালির ঝুমঝুমপুর থেকে তাঁকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। 

বিদেশে পলাতক আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে তিনি পরিচিত। সম্প্রতি চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি আলোচিত অপরাধে তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে আসে। চট্টগ্রামে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ইমনের লোকজন। 

চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক বলেন, ডেভিড ইমন চার দিন আগে যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢোকেন। সেই তথ্য পুলিশ পাওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের তথ্য পেয়ে তিনি আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পালানোর সময়ই তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ইমনের কাছে দুটি দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। প্রায় দেশে আসা-যাওয়া করতেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বসবাস করছেন। তাঁর সঙ্গে সেখানে থাকতেন ইমন। 

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চেক পোস্ট বসিয়ে ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিডকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের চারটি ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি টিম এ অভিযানে ছিল। সেখানে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশও ছিল। পরে ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

তিনি আরও বলেন, চেকপোস্টে ডেভিডকে আটকের পর তিনি ভুয়া ঠিকানা বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। আগে থেকে পুলিশের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল– তারা যশোরের ঝিকরগাছা হয়ে অবৈধভাবে দেশত্যাগের চেষ্টা করছিলেন। কীভাবে কোন চক্রকে ম্যানেজ করে তারা দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন, সেটি নিয়ে তদন্ত চলছে। 

চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, যশোর থেকে তারা বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছবেন। এ ছাড়া নোয়াখালীর সেনবাগ এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরেক সন্ত্রাসী রায়হানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়। তবে পুলিশ যাওয়ার আগেই বাড়ির দেয়াল টপকে পালিয়ে যান তিনি। তাঁকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 

সূত্র জানায়, চার দিন আগে দেশে ঢোকার পর ডেভিড ঢাকায় আসেন। এ বিষয়টি গোয়েন্দারা টের পান। এরপর তার ওপর নজর রাখা হচ্ছিল। 

আরেকটি সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পুলিশের অনেক সদস্য ঘুরে ঘুরে দায়িত্ব পালন করে। তারা বছরের পর বছর একই এলাকায় থাকায় ডেভিডের মতো অনেক অপরাধীদের সঙ্গে গোপন সখ্য গড়ে ওঠে। অনেক সময় গোপনে তথ্য দিয়ে তাদের সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।  

আলোচিত উক্তি দিয়ে জোড়া খুন থেকে চাঁদাবাজির ১৫ মামলার আসামি যশোরে গ্রেপ্তার ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের পাঁচ থানায় ১৫টি মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় মাইক্রোবাস ধাওয়া করে জোড়া খুন, ওই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে আরেক সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, ১৫ মামলার আসামি সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলাসহ খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি ডেভিড ইমন। সর্বশেষ গত ১১ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার অ্যাক্সেস রোডে অবস্থিত ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের (ডিডিএন) মালিক আদিল বিন মামুনকে ফোন করে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ চাঁদা দাবি করেছিলেন ইমন। ডেডলাইন দুই দিন শেষ হওয়ায় চাঁদা না পেয়ে ১৩ জুলাই ডিডিএন কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায় তাঁর অনুসারীরা।

এর আগে গত ১০ মে চট্টগ্রামের জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক বিপ্লব দেকে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করার হুমকি দেন। ইমন বলেন, ‘তোর শরীর...বোলতার বাসা বানিয়ে ফেলব। পুরো শরীরে এমনভাবে গুলি করা হবে, পরিবার গণনাও করতে পারবে না। যা করার, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে করতে হবে। গুলি মানুষ চেনে না।’ এ ঘটনায় নগরের কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বিপ্লব। 

চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের আজিজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে ফোনে হুমকি দেন ইমন। হুমকি দিয়ে বলেন, ‘৫০ হাজার পুলিশ নিয়ে থাকলেও ঘরে গিয়ে মেরে ফেলব। তোর ভাইকে যেমন ১০ হাজার মানুষের মাঝখানে গুলি করে মেরেছি।’ হুমকি পাওয়া আজিজ নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। 

তাঁর উদ্দেশে বলা হয়, ‘কয় দিন ঘরে বসে থাকবি? প্রশাসন কয়দিন পাহারা দেবে? তোকে মারলে কী হবে? ১টি খুন করলে যে সাজা, ১০টি খুন করলেও সে-ই সাজা।’ 
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে ইমন-রায়হান গ্রুপ। মুজিবুর রহমান দাবি করেন, বিদেশি একটি মোবাইল ফোন নম্বর থেকে কল দিয়ে বড় সাজ্জাদ পরিচয়ে তাঁর কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। বলে– ‘আমি রায়হান, চাঁদা না দিলে মাথার খুলি উড়ায় ফেলব।’ পরে তার বাসায় পরপর দুই দফায় গুলি করে তারা। 

২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর নগরের পাঁচলাইশ হামজারবাগ এলাকায় মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও গুলি চালায় ইমন ও তাঁর সহযোগীরা। ভবন মালিকের কাছে এর আগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। 

এর আগে ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরের মোহরায় মোহাম্মদ ইউনুসের বাসায় গুলি করে একদল অস্ত্রধারী। অস্ত্রধারীদের একজন বলতে থাকেন, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’ এ কথার পরই ইমনরা গুলিবর্ষণ করে চলে যায়। 

এ ছাড়া গত বছরের ২৫ অক্টোবর রাউজানে যুবদলের কর্মী আলমগীর আলম, গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট এলাকার এক ওষুধের দোকানিকে ফোনে হুমকি, কালুরঘাট শিল্প এলাকায় গার্মেন্টসে গুলি করার ঘটনায় ইমন-রায়হানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। 

সাধারণ তরুণ থেকে যেভাবে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ইমন মোবারক হোসেন সাধারণ নাম হলেও অপরাধ জগতে পা বাড়ানোর পর বনে যান ডেভিড ইমন। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এখন তিনি এক নামেই পরিচিত। 

মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়াতে কখনও পুলিশ কমিশনারকে জড়িয়েও দিয়েছেন বির্তকিত ভিডিও বার্তা। ইমন ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের কৃষক মো. মুসার ছেলে। 

পুলিশ জানায়, তাঁর কাছে ১৫ থেকে ২০টি ভারী অস্ত্র থেকে পিস্তল রয়েছে। অস্ত্র পরিচালনায় বেশ পারদর্শীও। মানুষ খুন আর চাঁদাবাজি এখন তাঁর নেশা ও পেশায় পরিণত হয়েছে। ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে কারাগারে পরিচয় হওয়ার পর সাজ্জাদের দলে যোগ দেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইমন ও রায়হান কারাগার থেকে জামিনে বের হন। এরপর ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে মিলে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তারা। ছয় থানার ১৫ মানুষের কাছে ছিলেন আতঙ্কের নাম চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং মহানগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ থানার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের চোখের ঘুম হারাম করে দিয়েছে ইমন গ্রুপ। 

গত দেড় বছরে চট্টগ্রামে জোড়াসহ ১১টি খুনের ঘটনায় ইমনের নাম উঠে এসেছে। হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এবং মহানগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ থানার ১৫টি মামলা ছাড়াও রয়েছে অনেক অভিযোগ। 

চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ডেভিড ইমন। এর আগে দেশে এ গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান পুরো গ্রুপের নেতৃত্ব দিয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। সাজ্জাদ বাহিনীর তিনজনের মধ্যে এখন বাকি রইল শুধু রায়হান। ১৫ মামলার এই আসামি পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।