ফাইল ছবি
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক ছিলেন রাশেদ মেহের চৌধুরী। সংস্থাটিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতিসহ মামলার আইনগত মতামত দেওয়া ছিল তার অন্যতম কাজ। তার বিরুদ্ধেই দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। হয়েছে বিভাগীয় মামলা। আইন কর্মকর্তা নিজেই এখন আইনের জালে।
রাশেদ মেহের চৌধুরী বর্তমানে বিমানের মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)। ফাইল আটকে রাখার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান। মামলা দুটিতে তার গাফিলতি এবং নথি দুই থেকে চার বছর আটকে রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই বিমানে আইন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন রাশেদ মেহের চৌধুরী। তখন আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তিনি সখ্য গড়ে তোলেন। বিমানের সব বিভাগে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেন। এ সুযোগে কোনো প্রকার মতামত না দিয়ে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১০টি নথি দুই থেকে চার বছর আটকে রাখেন।
ওই দুটি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভাগীয় মামলার তদন্তে রাশেদ মেহের চৌধুরীর অনেক গাফিলতি পাওয়া গেছে। এসব গাফিলতি বা দায়িত্ব অবহেলার কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হতে পারেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রশাসন বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর বিমানে রাশেদ মেহের চৌধুরীর পতন ঘটে। ওইদিন থেকেই তাকে আর বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকায় ঢুকতে দেননি সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তখনই তাকে ওএসডি করে বিমানের মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে সংযুক্তি দেওয়া হয়। এরপর গত ১৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (মামলা নম্বর-৩৭৭৯) করা হয়।
যেসব নথি নিয়ে অভিযোগ
ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, রাশেদ মেহের চৌধুরী আইন বিষয়ক উপ-বিভাগে কর্মরত থাকাকালে বিমানের বিভিন্ন দপ্তর থেকে ৯টি নথি মতামতের জন্য তার কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি নথির ওপর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করে দপ্তরে রেখে দেন।
এর মধ্যে একটি ২০১৯ সালে উচ্চ আদালতের আদেশ সম্পর্কিত, যেখানে আদালত দুজন ক্যাজুয়াল অপারেটরকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার বিষয়টি বিবেচনার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু রাশেদ মেহের চৌধুরী এ ফাইল আটকে রাখেন। অথচ ওই দুই কর্মচারীর মতো একই বিষয়ে আগে তিনি নিজ উদ্যোগে কয়েকজনকে ক্যাজুয়াল চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ চার বছর সাতমাস ওই নথিটির কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত দেননি। নিজের দপ্তরে রেখে দেন। এতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা যায়নি এবং ওই কর্মচারীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন।
২০২১ সালে জেদ্দাগামী বিমানের ফ্লাইটে জীবাণুনাশক স্প্রে না করায় বিমানের চিফ পার্সার হারুন অর রশিদের কাছে ৫৮ হাজার ৭৫০ সৌদি রিয়াল (প্রায় ১৮ লাখ টাকা) আর্থিক ক্ষতি আদায় সংক্রান্ত নথি তিন বছর আটকে রেখেছিলেন রাশেদ। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কাছ থেকে ৫৮ হাজার ৭৫০ রিয়াল আদায় করা সম্ভব হয়নি। এতে বিমানের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
গত ১৯ আগস্ট ওই ৯টি ফাইল আটকে রাখার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কাজ হাতে পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ ধরনের তদন্তের জন্য অন্তত ৬০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। চাইলে তদন্তের সময় আরও বাড়াতেও পারেন তদন্ত কর্মকর্তা। আরেকটি মামলার আপডেট আমার জানা নেই।- বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম
২০১৯ সালে পেনশনের পাওনা থেকে কেটে রাখা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে বিমানের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্সে আবেদন করেন এক কর্মচারী। ওই আবেদনটি চার বছর সাত মাস আটকে রাখেন রাশেদ মেহের চৌধুরী। এই সময়ের মধ্যে তিনি আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। বেআইনিভাবে আবেদনটা আটকে রাখেন।
একই বছর বিমানে কর্মরত থাকা অবস্থায় এক কর্মচারীর মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণের একটি নথিটিও চার বছর ছয় মাস আটকে রেখেছিলেন রাশেদ। আবার ২০২০ সালে মানবিক কারণে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদনের আরেকটি নথি কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত না দিয়ে চার বছর তিন মাস বেআইনিভাবে আটকে রাখেন তিনি।
এছাড়া ২০২১ সালে পাঁচজন বৈমানিকের বেতন বৈষম্য দূরীকরণের আবেদন সংক্রান্ত একটি নথি দুই বছর, ২০২২ সালের আরেকটি এজেন্সির হালানাগাদ তথ্যের একটি নথি ১৪ মাস আটকে রেখে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি রাশেদ মেহের চৌধুরী।
বিমানের ওই বিভাগীয় মামলার নথিতে আরও বলা হয়, ওই কর্মকর্তার এমন কার্যকলাপ সম্পূর্ণ নিয়ম এবং শৃঙ্খলাবহির্ভূত। এমন বেআইনি কার্যকলাপের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিমানের প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াসহ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা বেআইনি, নিয়মবহির্ভূত, অমানবিক ও শৃঙ্খলাবহির্ভূত কার্যকলাপ, বিমানের সার্ভিস রেগুলেশন ১৯৭৯ এর লঙ্ঘন। এছাড়া বিমানের কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালার কয়েকটি ধারা অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ওই বিভাগীয় মামলায় সই করেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. সাফিকুর রহমান।
ফাইল আটকে রাখায় জড়িত একজনের নিরাপদে অবসরের সুযোগ
২০২৫ সালের ১৭ জুন বিমানের লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক রাশেদ মেহের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরেকটি বিভাগীয় মামলার অনুমোদন দেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাফিকুর রহমান। ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপক (ফ্লাইট সার্ভিস) মোহাম্মদ নুরুজ্জামান রঞ্জুর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণের অনুমোদন দেন তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বিভাগীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রশাসন বিভাগের তদন্ত শাখা থেকে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণী তৈরি করতে লিগ্যাল ভেটিংয়ের জন্য আইন উপ-বিভাগে পাঠানো হয়।
তখন রাশেদ মেহের চৌধুরী খসড়া চার্জশিটে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সম্পর্কে আপত্তিকর তথ্য থাকার কথা বলে ওই ভেটিং ও পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য তার অধীনস্ত কর্মকর্তাকে মৌখিক নির্দেশ দেন। তখন ওই কর্মকর্তা নথি আটকে থাকার বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার আলাপ করেন। কিন্তু তিনি তা রেখে দিতে বলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের আগস্টে আইন উপ-বিভাগের শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত তিনি নথি রেখে দেন। সময়মতো অভিযোগপত্র ও অভিযোগ বিবরণী ভেটিং না করায় এবং কালক্ষেপণ করায় মোহাম্মদ নুরুজ্জামান রঞ্জুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব হয়নি।
পরে এ কারণে রাশেদ মেহের চৌধুরীকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয় বিমান। কিন্তু ওই কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক বিবেচিত হয়নি, যা বিমানের কর্মচারী (চাকরি) প্রবিধানমালা অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন রাশেদ মেহের চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমি যথাসময়েই সব ফাইল বা নথি সাবমিট করেছি। কারও নথি আটকে রাখিনি। তার তথ্য-প্রমাণ তদন্ত কমিটির কাছে দিয়েছি। এখন কমিটি যাচাই-বাছাই করবে।’
ওই দুটি বিভাগীয় মামলার তদন্ত করছেন বিমানের এয়ারপোর্ট সার্ভিসের মহাব্যবস্থাপক মনিরুল ইসলাম। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এসময় তিনি বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলামের মন্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
পরে জানতে চাইলে বোসরা ইসলাম বলেন, ‘গত ১৯ আগস্ট ওই ৯টি ফাইল আটকে রাখার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কাজ হাতে পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ ধরনের তদন্তের জন্য অন্তত ৬০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। চাইলে তদন্তের সময় আরও বাড়াতেও পারেন তদন্ত কর্মকর্তা। আরেকটি মামলার আপডেট আমার জানা নেই।’













