ঢাকা,  শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬,

বিজয় রাকিন সিটি

বিজয় রাকিন সিটি

ছবি: গণবাংলা

মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তানদের আবাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাট লুটপাট করে নিয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ভূমিহীন ও বেকার সেজে সরকারের আমলা, পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠেছে এমন অভিযোগ। এছাড়া প্রকল্প ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতি, সমিতির গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে পছন্দসই সদস্য অন্তুর্ভূক্তি এবং যাচ্ছেতাই ফ্ল্যাট বরাদ্দে বিস্তর অভিযোগ ওঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির নথি, প্রশাসনিক তদন্ত, আদালতে চলমান মামলা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর চিত্র। 
১৯৯৩ সালে ১৫ জন কার্যকরী সদস্য ও ৪৯ জন সাধারণ সদস্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া ভূমিহীন ও বেকার মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসনের উদ্দেশ্যে ঢাকার মিরপুরে ১৬.০২ একর জমির বরাদ্দপত্রে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। ১৯৯৭ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন লাভ করে সমিতিটি। উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে ২০১০ সালে ডেভলপার কোম্পানী ‘রাকিন’ এর সাথে ৫৭:৪৩ অনুপাতে চুক্তিবদ্ধ হয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি। আবাসনের নাম দেওয়া হয় ‘বিজয় রাকিন সিটি’। 
ফ্ল্যাট বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি এ টি আহমেদুল হক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: মোর্শেদুল আলম অনিয়ম দুর্নীতি করতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের বাদ দিয়েছেন। তারা জানান, শুরুতে জমির বরাদ্দ প্রকৃত সদস্যদের নামে থাকলেও পরে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. মোর্শেদুল আলম কৌশলে সেই বরাদ্দপত্র নিজের নামে করে নেন। বিষয়টি জানাজানি হলে সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তিনি পুনরায় সমিতির নামে বরাদ্দ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন।
সমিতি সুত্রে জানা গেছে, সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের অনিয়ম, দুর্নীতি তদন্ত রিপোর্টে ওঠে আসায় তাদের অপসারণ করে সমিতিতে প্রশাসক নিয়োগ করেছে সমিতি নিবন্ধন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্য হালনাগাদ করে তালিকা জমা দিতে বলেছে। একই সাথে সমিতির গঠনতন্ত্র ও জমি বরাদ্দ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের শর্ত মেনে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে নির্দেশনা দিয়ে আদেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। 
সমিতির সাবেক সদস্য ও সমিতির পুরনো নথি ঘেটে জানা যায়, জমি নিজের নামে করতে না পেরে সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে নিকটাত্মীয়, পরিচিত ব্যক্তি এবং অমুক্তিযোদ্ধা সরকারী আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন সদস্য তালিকা চূড়ান্ত করেন। 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুস সাত্তার গণবাংলাকে বলেন, সমিতির তৎকালীন সেক্রেটারী নিজেই অমুক্তিযোদ্ধা। ফ্ল্যাট আর অর্থ লোভে তিনি সমিতির সগঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে একক নিয়ন্ত্রক বনে যান। সাথে ক্ষমতাবান আমলা, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের সাথে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্ল্যাট দখলে করেন। আমাদের বঞ্চিত করে তিনি নিজে ৬০টির মত ফ্ল্যাটের মালিক বনে যান। প্রতিবাদ করায় আমার নামে ৭টি মামলা দিয়ে হয়রানী করেন। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় আমি বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে উচ্চ আদালতে একটি মামলা দায়ের করি। আশা করি ন্যায় বিচার পাব। একই সঙ্গে যারা জাল-জালিয়াতি করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্ল্যাট লুটপাট করেছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হোক এবং তাদের নামে অবৈধভাবে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাট বাতিল করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দ দেওয়া হোক।   
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সমিতির সদস্য সংখ্যা ৫১৬ জন, যার মধ্যে ৩৩৪ জনই অমুক্তিযোদ্ধা। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকশ মুক্তিযোদ্ধা এই প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও প্রথম ও দ্বিতীয় সদস্য তালিকা মিলে চূড়ান্ত করা হয় ২৯৫ জনের নাম। এর মধ্যে ১১০ জনই অমুক্তিযোদ্ধা। ২৯৫ জনের মধ্য থেকে মাত্র ৫৭ টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। সমিতির অভিযোগ অনুযায়ী ওই ৫৭ জনের মধ্যেও ২৫ জন অমুক্তিযোদ্ধা। ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হন। বঞ্চিত সদস্যদের অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২৩৮ জন বঞ্চিত সদস্য (মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য সদস্য) হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। মামলার নম্বর ৬২৩৮/২৫। 
সমিতির নথি অনুযায়ী, বিজয় রাকিন সিটি প্রকল্পের ১৯৮৫ টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ৮৭০টি ফ্ল্যাট অংশ হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি নামে। অথচ এই ৮৭০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে মাত্র ৩২ জন সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ৩৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পান। বাকী ৮৩৮ টি ফ্ল্যাট অমুক্তিযোদ্ধা, দুর্নীতিবাজ আমলা ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে ভাগবাটোয়ারা করে দেওয়া হয়। 
তৎকালীন সভাপতি আহমেদুল হক ও সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলমের অনিয়ম দুর্নীতি বিষয়ে প্রতিবাদ করায় ১১টি মামলায় দীর্ঘ কারাবাসে কাটাতে হয়েছে সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির অর্থ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মো: বেলায়েত হোসেনকে। তিনি গণবাংলাকে বলেন, আমার অপরাধ আমি তাদের স্বজনপ্রীতি সদস্য তালিকার প্রতিবাদ করেছি। আমার অপরাধ আমি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের নামে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে বলেছি। তাদের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে সোচ্ছার থেকেছি। বিনিময়ে তারা আমাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছে। আমাকে জেল খাটিয়েছে। আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়ে যেখানে ফ্ল্যাট পাইনি সেখানে অন্যদের কী পরিণাম অপমান অপবদস্ত করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। শুধু দলীয় ক্ষমতার দাপটে তারা এসব করেছেন। বর্তমান সরকারের কাছে দ্রæততম সময়ে এসব সুরাহা করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।  
জানা যায়, পূর্বের সদস্য তালিকা অনুসরণ না করে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. মোর্শেদুল আলম এবং তৎকালীন সভাপতি এ টি আহমেদুল হক নিজেদের বিবেচনায় নতুন সদস্য সংগ্রহ করে তাদের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেন। সমিতির নথির তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি, উচ্চপদস্থ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ মোট ১৩০ জনের নামে ২১৫টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। 
সমিতির ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকা ঘেটে জানা যায়, ভ‚মিহীন ও বেকার মুক্তিযোদ্ধা সেজে যারা ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পিএসসি চেয়ারম্যান ও সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এ টি আহমেদুল হক। তিনি ও তার স্ত্রী মিনারা বেগমের নামে ২টি করে মোট ৪টি, প্রবাসী দুই মেয়ে তানিয়া চৌধুরী ও ত্রোপা চৌধুরীর নামে ১টি করে মোট ২টিসহ ৬টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। দলীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব খাটিয়ে সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: মোর্শেদুল আলম ও তার ৩৬ জন আত্মীয়র নামে ৫৯ টি ফ্লাট বরাদ্দ নিয়েছেন। এরমধ্যে নিজের ও স্ত্রীর নামে ২টি করে, শাশুড়ির নামে ৪টি; শালা, শালী ও শালার বউয়ের নামে ১০টি; ভাতিজা, ভাতিজি ও ভাতিজা বউয়ের নামে ১২টি; ভাগিনা, ভাগনির নামে ১৪ টি ফ্লাট রয়েছে। 
একইভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের ২ ছেলে এবং ১ মেয়ের নামে ৩টি, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হকের ২ মেয়ের নামে ২ টি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী এ্যাড. কামরুল ইসলামের নামে ২টি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ২ ছেলের নামে ২টি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ. ফ. ম বাহাউদ্দিন নাসিম ও তার ভাইয়ের নামে ৪ টি, সাবেক আইন মন্ত্রী এ্যাড, আব্দুল মতিন খসরুর নামে ২টি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের স্ত্রীর নামে ১টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জের সাবেক মেয়র কাজী লিয়াকত আলীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের ২২ জন রাজনৈতিক নেতার মধ্যে ৪০ টি ফ্লাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 
সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, এ কে এম শহীদুল হক, নুর মোহাম্মদসহ ৫ জন আইজিপি, ইব্রাহিম ফাতেমী, আলী ইমাম চৌধুরী, আব্দুর রহিম, নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরাসহ ৯জন অতিরিক্ত আইজিপি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করে ফ্লাট বরাদ্দ নিয়েছেন। এছাড়া সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পুলিশের উচ্চ পদস্থ ২৩ জন কর্মকর্তার নামে ৭০ টি ফ্লাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সাবেক সচিব আবু আলম মো: শহীদ খান ও তার পরিবারের নামে ৪টি, বিচারপতি নাঈমা হায়দারকে ১টি ও আওয়ামী লীগ সরকারের ২১ জন সচিবদের মধ্যে ২১ টি ফ্লাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সর্বমোট ১২৯ জনকে ২১৪টি ফ্লাট দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি'র নিবন্ধিত গঠনতন্ত্রে সদস্য পদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ১১ ধারায় উল্লেখ আছে ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার রক্ত সম্পর্কী (সন্তান) সদস্য হতে পারবেন।’ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই এই সংগঠনের ভোটার এবং সদস্য হতে পারবেন মহামান্য হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়েছে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তিনবার শুধুমাত্র প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই এই সংগঠনের সদস্য এবং ভোটার হতে পারবেন উল্লেখ আছে। এসব তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার জোরে সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক যাচ্ছেতাই করে সদস্যপদ দিয়ে তাদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছেন। এতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের বঞ্চিত করা হয়েছে। 
এসব অভিযোগ নিয়ে বিস্তর কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির তৎকালীন সভাপতি এ টি আহমেদুল হকের সাথে। তিনি গণবাংলাকে বলেন, গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে সদস্য অন্তর্ভূক্ত ও তাদের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিগতভাবে ঠিক হয়নি। সমিতির গঠনতন্ত্রের ১১ ধারায় যে পরিবর্তনটা এনে সবার জন্য সদস্যপদ উন্মুক্ত করা হয়েছে তার পক্ষে আমার সায় ছিল না। আমার করারও কিছু ছিল না। তবে আমি মনে করি এতে আইনগত কোন সমস্যা নেই। গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে অমুক্তিযোদ্ধাদের বরাদ্দ দেওয়া ফ্ল্যাট বাতিল হতে পারে কিনা জানতে চাইলে সাবেক এই আমলা বলেন, বর্তমান প্রশাসক এটা পারবেন না। তবে জমি ও ফ্ল্যাট বরাদ্দপত্র প্রদানকারী সংস্থা গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ বা অন্যকোন সরকারী সংস্থা চাইলে পারবেন। আদালত চাইলেও পারবেন। তবে এটা সহজ না। 
অভিযোগ বিষয়ে জানতে সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মো: মোর্শেদুল আলমকে বারবার ফোন কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেন নি।
এদিকে বিক্ষুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আদালতের চলমান মামলা এবং সদস্যদের দাবির মুখে অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে সমিতি পরিচালনা, গঠনতন্ত্র অনুসরণ এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠে আসে। এরপরই সমিতির চলতি কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয় প্রশাসক নিয়োগ করে নিবন্ধন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটি। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রশাসক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে দায়িত্ব প্রদান করে। 
জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির প্রধান নির্বাহী খ. ম. আমীর আলী গণবাংলাকে বলেন, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত এই প্রকল্পটি অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিগত সময়ে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা সমিতিকে কুক্ষিগত করে নিজেদের মত ব্যবহার করেছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যরা এসব সহ্য করবেন না বিধায় তাদের বাদ দিয়ে আমলা, পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছে। এসব করেছেন নিজেদের ক্ষমতা পাকাপক্ত করার জন্য। অনিয়ম দুর্নীতি ঢাকার জন্য। তিনি বলেন, আমরা চাই, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রাপ্য ফিরে পাক। এজন্য প্রশাসক কাজ করছেন।  
গণবাংলার সঙ্গে আলাপকালে প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, সমিতি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্দেশ্য থেকে সমিতি বিচ্যুত হয়েছে। তার ভাষ্য, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অগঠনতান্ত্রিকভাবে সমিতি পরিচালনা করেছে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবর্তে অমুক্তিযোদ্ধাদের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট সংঘটিত করেছে। তিনি বলেন, আমার দায়িত্ব হলো সমিতির গঠনতন্ত্র, জমি বরাদ্দের শর্ত এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। আমি সেই দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তিনি আরও দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাকে নানাভাবে বাঁধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। পাহাড়সম সমস্যা অতিক্রম করে সামনে এগোতে হচ্ছে। আমি যাতে দায়িত্ব পালন করতে না পারি সে জন্য প্রতিপক্ষ একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করছে। তারপরও আমি বিশ্বাস করি, শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই ন্যায়বিচার পাবেন।