ছবি: সংগৃহীত
মিজানুর রহমান মিজান, চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা চরগুলো একসময় ছিল অনিশ্চয়তার প্রতীক। বর্ষায় বন্যা, শীতে খরা—প্রতিবছরই ফসল হারানোর ভয় তাড়া করত চরাঞ্চলের কৃষকদের। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেই অনিশ্চয়তা এখনো আছে, তবে বদলে যাচ্ছে কৃষকের প্রতিক্রিয়া। ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি ফসলের পরিবর্তে তারা বেছে নিচ্ছেন স্বল্পমেয়াদি ও লাভজনক ফসল—সরিষা।
আগে চরাঞ্চলে আমন ধানই ছিল প্রধান ফসল। কিন্তু অনিয়মিত বন্যা, নদীভাঙন ও বর্ষা শেষে দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের কারণে ধানের ফলন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শীতকাল তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় এবং বৃষ্টিপাত কম থাকায় সরিষা চাষের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আমন ধান কাটার পর জমি আর ফাঁকা থাকছে না—সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে হলুদ সরিষা।
চিলমারী উপজেলার কৃষক রহিম মিয়া বলেন,“ধান করলে ঝুঁকি বেশি। সরিষায় সময় কম লাগে, খরচও কম। তিন মাসেই ফসল ঘরে তোলা যায়।”
কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে খরচ বাদ দিয়ে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব। বর্তমানে বাজারে সরিষার দাম ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি হওয়ায় আগ্রহ আরও বেড়েছে। এটি চরাঞ্চলের কৃষকের জন্য জলবায়ু অভিযোজনের একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কৌশল হয়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চিলমারী উপজেলায় ১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। ২ হাজার ৩০০ জন কৃষককে বীজ ও সার প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় চরাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ফসল দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনিয়মিত বন্যা, নদীভাঙন এবং বর্ষা শেষে হঠাৎ দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের কারণে ধানসহ অনেক ফসলের ফলন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় সরিষার মতো স্বল্পমেয়াদি ফসল চরাঞ্চলের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অভিযোজন কৌশলগুলোর একটি। কম সময়ে, কম খরচে এবং তুলনামূলক কম পানিতে উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় সরিষা কৃষকের ঝুঁকি কমায় ও আয় নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে এটি আমন ও বোরো ধানের মাঝখানে একটি বাড়তি ফসল হিসেবে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় টেকসই কৃষির পথ দেখাচ্ছে।
”সরিষা চাষ বাড়লেও চরাঞ্চলে ঘানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তেল উৎপাদনের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় আরও বাড়তে পারে। এই হলুদ মাঠ শুধু সরিষার নয়—এটি জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে টিকে থাকার গল্প। চরাঞ্চলের কৃষকের এই অভিযোজন দেখায়, সঠিক ফসল নির্বাচন ও নীতিগত সহায়তা পেলে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও কৃষি হতে পারে সম্ভাবনার নতুন নাম।













