ছবি: সংগৃহীত
এবারের নির্বাচনে ভোটাররা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল কিংবা ‘মার্কা’ দেখে নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও যোগ্যতা দেখে ভোট দিতে চান। ভোটারদের এই নতুন প্রবণতা প্রচলিত দলীয় রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে- শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত এক জরিপ প্রতিবেদনে নির্বাচনী পরিবেশ ও ভোটারদের মনস্তত্ত্বের এই পরিবর্তন ফুটে উঠেছে।
বুধবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে এই গোলটেবিলের আয়োজন করে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)। দেশের ৫টি জেলায় পরিচালিত এই জরিপে মোট ৬০০ জন (৪০০ জন প্রত্যক্ষ এবং ২০০ জন পরোক্ষ) অংশীজন তাদের মতামত প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি চুক্তি। ত্রিশটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘ নয় মাস নিরবচ্ছিন্ন আলোচনার মাধ্যমে এজেন্ডাগুলো তৈরি করেছে। তাই এ চুক্তির বাস্তবে রূপ দেয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও বর্তায়। এটি কোনো চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। এটি অগুনতি শহীদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে।
তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান রায় দিয়েছে, বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অভ্যুত্থান রায় দিয়েছে, বাংলাদেশে আর কেউ ফ্যাসিবাদী কিংবা জমিদারিতন্ত্র কায়েম করতে পারবে না। ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অভ্যুত্থান রায় দিয়েছে, মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার জন্য নির্বাচন দরকার।
তিনি আরও বলেন, যদি ন্যায়বিচার চাই, সংস্কার চাই এবং নতুন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই—তাহলে নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। গণভোট, নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার—সবকিছুর ক্ষমতা জনগণের হাতেই।
আলী রীয়াজ বলেন, দেশের ছাত্র-জনতা জীবন বিনিময় করে ফ্যাসিবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্তি পেয়েছে। এখন আমরা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথযাত্রায়। সেই গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে করে আমরা সবাই মনে করি আমরা প্রত্যেকেই এই রাষ্ট্রের মালিক। সুতরাং আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রত্যেকের স্বাধীনভাবে, মুক্তভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে হবে, গণভোটে হ্যাঁ-তে রায় দিতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতে আমরা একটি সমৃদ্ধিশালী, সাম্যভিত্তিক, মানবিক, মর্যাদাভিত্তিক সুবিচারের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করব। সেই প্রতিষ্ঠার জন্য আপনারা প্রত্যেকেই আগামী ১২ তারিখে হ্যাঁ'র পক্ষে প্রচারণা চালাতে হবে।
প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা এখন মুখ্য
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে ভোটাররা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল কিংবা ‘মার্কা’ দেখে নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও যোগ্যতা দেখে ভোট দিতে চান। ভোটারদের এই নতুন প্রবণতা প্রচলিত দলীয় রাজনীতির সমীকরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সংস্কার ও আস্থার সংকট
নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকটে ভুগছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষ করে, জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে; মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে এই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া, জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কথা বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে তার কোনও প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘন
মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। প্রার্থীরা প্রচারণার ক্ষেত্রে গঠনমূলক আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণে বেশি লিপ্ত হচ্ছেন। জরিপের অন্যান্য পর্যবেক্ষণ হলো- রংপুর ও ফরিদপুর জেলায় সহিংসতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। ডিজিটাল অপতথ্য এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের কারণে স্থানীয় যুবসমাজ চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। জরিপে ভোটাররা তিনটি প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন- ১. নিরপেক্ষ প্রশাসন ২. জবাবদিহিতা ও ৩. কাজের বাস্তবায়ন।
একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, আসন্ন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ সচেতন, যা তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির, বক্তব্য দেন ইনস্টিটিউটের ডিসটিংগুয়েসড ফেলো সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান। সার্ভে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন চৌধুরী সামিউল হক। আলোচনায় বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা, সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।













