ছবি: সংগৃহিত
জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী বাস্তুতন্ত্র, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত এবং অসংখ্য নদীতে বেষ্টিত হওয়ায় বাংলাদেশ বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বিরূপ তাপমাত্রার মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বিশ্বব্যাংকের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির ৯ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ০.৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের অসম বোঝা বহন।
রোববার (৪ অক্টোবর) ‘জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০’ বিষয়ক অংশীজন কর্মশালায় চট্টগ্রামে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কৃষি, মৎস্য, অবকাঠামো, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কোনো একক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে মতামত দেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ।
জলবায়ু পরিবর্তন দেশের জীববৈচিত্র্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি
কয়েক দশকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০ দশমিক ৫ থেকে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি কৃষি, মানবস্বাস্থ্য, পানিসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ও তাপজনিত চাপের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে থাকে।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা কারণে দেশের জীববৈচিত্র্য নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে শুধু নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। কৃষি, মৎস্য, পর্যটন, অবকাঠামোসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি সমন্বয় করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের অঞ্চলভিত্তিক জীববৈচিত্র্য,স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা এবং পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যকে পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম,উপকূলীয় এলাকা এবং হালদা ও কর্ণফুলী নদীর প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষায় স্থানীয় বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো জাতীয় পরিকল্পনায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয় এ কর্মশালায়।
চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, উপকূলীয় অঞ্চল ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিবেশ দেশের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি সংরক্ষণ কার্যক্রমকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাতে মারাত্মক ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত কৃষি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বন্যা সরাসরি ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সঠিক সমাধান করা না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে সামগ্রিক বৈশ্বিক শস্যের ফলন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
এ ছাড়া ভারতের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান উৎপাদন ১৫ শতাংশ এবং গম উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও প্রভাব ফেলছে। দেশে প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ কোটি মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস করে, যারা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের আয়োজনে এ কর্মশালা অংশীজনদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে প্রণীত জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে এনবিএসএপি ২০২৬-২০৩০ যেন কেবল নীতিগত দলিলে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ নেয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী। কর্মশালায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।



















