ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ,

আগুন জ্বললেই জ্বলে ওঠে কমিটি

আগুন জ্বললেই জ্বলে ওঠে কমিটি

ফাইল ছবি

গত কয়েক দশকে ব্যস্ততম রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু দায়িত্বহীনতার কারণে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনও মামলা হয় না। আবার যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলোর বিচার আলোর মুখ দেখেনি আজও।

হাতেগোনা দু-একটি ক্ষেত্রে মামলা হলেও সাজার কোনও নজির নেই। মামলা করার পর সমালোচনার মুখে পড়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গ্রেফতার হলেও কিছুদিন পর জামিনে মুক্তি পেয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান তারা। প্রতিবার আগুনের রোমহর্ষক ঘটনায় দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এরপর তৎপরতা দেখায় প্রশাসন। কিন্তু কিছুদিন যেতেই অন্য কোনও ঘটনায় চাপা পড়ে যায় সব আলোচনা।


সর্বশেষ গত ২৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে ৭ তলা (গ্রিন কোজি কটেজ) ভবনে ঘটে যায় অগ্নিকাণ্ডের মর্মান্তিক ঘটনা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৪৬ জন। দগ্ধ হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন অনেকে। আবারও নানা প্রশ্ন উঠেছে, কেন থামানো যাচ্ছে না অগ্নিকাণ্ড? কেন দায়ী ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে? কেন বিচার শেষ হয় না? আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে?


আইনজীবীরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অধিকাংশ মামলা সাক্ষীর অভাবে ঝুলে থাকে। এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা যেমন প্রতিবেদন দিতে দেরি করেন, আবার সাক্ষীরা আদালতে হাজির হন না। আর আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে অধিকাংশ বাড়ির মালিক জড়িত থাকেন। তারা অতি লাভের আশায় অসাধুভাবে বাসাবাড়ি ভাড়া দেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু  বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো খুবই মর্মান্তিকভাবে ঘটে। তবে এটা ঠিক অগ্নিকাণ্ডের সব ঘটনায় মামলা করা হয় না। যেকোনও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যতে সবাই সতর্ক থাকবে।

গত কয়েক দশকে অগ্নিকাণ্ডের মামলায় একটাও সাজা হয়নি, এটা সঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলায় সাজা হয়েছে। আসামিরা শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের অধিকাংশ মামলা সাক্ষীর অভাবে ঝুলে থাকে। একদিকে যেমন তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদন দিতে দেরি করেন, অন্যদিকে সাক্ষীরা আদালতে হাজির হন না। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষীদের হাজির হতে সমন পাঠালেও সাক্ষীরা উপস্থিত না হওয়ায় মামলা শেষ হতে দেরি হচ্ছে। ঢাকার আদালতে যেসব অগ্নিকাণ্ডের মামলাগুলো পেন্ডিং রয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।

তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পর কোন মামলায় সাজা হয়েছে, তা সঠিক করে বলতে পারেননি এই পাবলিক প্রসিকিউটর।


ঢাকার জজ আদালতের নিয়মিত প্র্যাকটিস করেন অ্যাডভোকেট মীর আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, আমার জানামতে এখন পর্যন্ত ঢাকার ভেতরে অগ্নিকাণ্ডের মামলায় সাজা হতে দেখিনি। আমি বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছি। অধিকাংশ মামলায় প্রতিবেদন দাখিল ও সাক্ষ্যগ্রহণে আটকে রয়েছে। ফলে মামলার সঙ্গে জড়িত নয়, এমন ব্যক্তিরাও আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকা জজ আদালতের আরেক আইনজীবী আজাদ রহমান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেশ কিছু মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়। ঘটনার পর বেশ কিছু সংস্থা তদন্ত কমিটি গঠন করলেও প্রতিবেদন কিন্তু জনসমক্ষে আসে না। আবার অনেকেই পরবর্তী সময়ে ঝামেলা এড়াতে মামলাও করতে রাজি হন না। এভাবেই ঘটনাক্রমে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যায়।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে অধিকাংশও বাড়ির মালিক জড়িত থাকেন। অসাধুভাবে বাসা বাড়িতে অতি লাভের আশায় দোকান, বিভিন্ন রকমের গোডাউন ভাড়া দিয়ে থাকেন। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে।

অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে সাধারণ আইনগুলোকে আর কঠোর করতে হবে জানিয়ে তারা বলেন, উপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে দোষীদের সাজার নজির সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষার দিকে বাসামালিকরা নজর দেবেন না।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ২০১৪ সালের অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ বিধিমালা স্থগিত করায় আমাদের ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব করা হয়েছে। আমরা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারি না। অন্যদিকে আসামিরা অনেক বড় বড় রাঘব-বোয়াল। আইনের কিছু দুর্বলতার কারণে অপরাধীরা খুব সহজেই ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যেতে পারছে। যে কারণে অন্যরা অপরাধ করতে উৎসাহিত হচ্ছে। কঠোর সাজার ব্যবস্থা থাকলে অন্যরাও নিরুৎসাহিত হতো।

তিনি আরও বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করার বিষয়টি ভিন্ন রকম। একজন পুলিশ কর্মকর্তা মামলা করলে তাকে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। আদালতে যাতায়াতের বাড়তি খরচও বহন করা হচ্ছে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা কখনও এক থানায় অবস্থান করেন না। কয়েক বছর পরপর এক জেলা থেকে অন্য জেলায় অবস্থান করতে হচ্ছে তাদের। অন্য জেলা থেকে এসে আদালতে উপস্থিত হয়ে মামলা পরিচালনা করতে অনেকটাই কষ্ট হয়।

যদি শুধু পুলিশের একটি পোস্টের ওপর নির্ভর করে মামলা করা হতো, তাহলে ভালো হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন সাব-ইন্সপেক্টর বদলি হয়ে গেলে অন্য কেউ এসে ওই জায়গা থেকে সহজেই মামলা পরিচালনা করতে পারতো। কিন্তু মামলা করার জন্য একজন ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা দিতে হয়। এসব কারণে মামলার দিকে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।


ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ১২৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা তদন্ত ধামাচাপা পড়ে গেছে। আলোচিত ওই ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছিল। তবে সেটির তদন্ত বিষয়ে আর কোনও অগ্রগতি আদালতে জমা হয়নি।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় ভয়াবহ আগুনে অন্তত ১১২ জনের মৃত্যু হয় এবং দুই শতাধিক শ্রমিক আহত হন। ওই ঘটনায় মামলা হলেও আজও বিচার শেষ হয়নি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটে আরও মর্মান্তিক ঘটনা। সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ১০ তলাবিশিষ্ট রানা প্লাজা ধসে নিহত হয় ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাককর্মী। আহত হন আরও প্রায় দেড় হাজার মানুষ। এত প্রাণহানির পেছনে যাদের দায় ছিল, ১১ বছরেও তাদের কেউ শাস্তি পায়নি।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জনের প্রাণহানির পর অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করা হলেও আজও বিচার শেষ হয়নি। একই বছরের ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে ফারুক-রূপায়ণ (এফআর) টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৭ জন নিহতের মামলার চার বছর শেষ হলেও এখন বিচার হয়নি।

২০২১ সালের ২৭ জুন সন্ধ্যায় মগবাজারের ‘রাখি নীড়’ নামের ভবনের নিচতলায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন দুই শতাধিক ব্যক্তিও। ঘটনায় পরদিন ২৮ জুন অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে রাজধানীর রমনা থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন পুলিশ। মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেননি পুলিশ। দাখিল হয়নি তদন্ত প্রতিবেদনও।


২০২৩ সালের ৭ মার্চ গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারে বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড কাউন্টারের পাশে একটি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৪ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয়েছেন ১২০ জনেরও বেশি। এক বছরেও দাখিল হয়নি এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন। একই বছরের ৪ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের ওপর হামলা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনও দাখিল হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অধিকাংশ মামলায় আসামিরা জামিনে রয়েছেন।

সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) রাতে রাজধানীর বেইলি রোডে ৭ তলা (গ্রিন কোজি কটেজ) ভবনে আগুন লাগে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৬ জন মারা গেছেন। ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও আট জন শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে ৪০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। ৩৮ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শুক্রবার (১ মার্চ) রাতে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় এ মামলা কতদূর গড়ায়।


১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মিরপুরের সারেকা গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যান। ১৯৯৫ সালে ঢাকার ইব্রাহিমপুরের লুসাকা অ্যাপারেলসে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ১৯৯৬ সালে ঢাকার তাহিদুল ফ্যাশনে ১৪ জন এবং সিনটেক্স লিমিটেডের কারখানায় ১৪ জন পুড়ে মারা যান।

১৯৯৭ সালে মিরপুরের তামান্না গার্মেন্টে ২৭ জন এবং মিরপুর ১ নম্বর মাজার রোডের রহমান অ্যান্ড রহমান অ্যাপারেলসে আগুনে ২২ জন মারা যান। ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার লিমিটেডে আগুনে ৫৩ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই বছরে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়িতে গ্লোব নিটিং ফ্যাশন লিমিটেডে ১২ শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডে মারা যায়।

২০০১ সালে মিরপুরের মিকো সোয়েটার লিমিটেডে আগুনের গুজবে পদদলিত হয়ে মারা যান ২৪ শ্রমিক। ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে সান নিটিং গার্মেন্টে আগুনে ২০ শ্রমিক মারা যান।

২০২৩ সালের রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড, বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ড, পুরান ঢাকার আলুবাজারে একটি বহুতল ভবনে আগুন ও নাজিরা বাজারে একটি দোকানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব বড় অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার একটিতেও কোনও মামলা করা হয়নি।