ঢাকা,  রোববার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ,

জাহাঙ্গীর ইস্যুতে নেত্রীর কান ভারী করা আ’লীগ নেতারা এখন নিরব

জাহাঙ্গীর ইস্যুতে নেত্রীর কান ভারী করা আ’লীগ নেতারা এখন নিরব

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা থেকে তৃণমুলের কর্মী পর্যন্ত একটি উক্তি স্পষ্ট-‘দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’ সকল ক্ষেত্রে এই উক্তিটি সত্য হলেও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র এড. জাহাঙ্গীর আলমের ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টো। দলের সম্পাদক মন্ডলীর সভায় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে দলীয় সভাপতির কাছে উত্থাপন করা হয়। এই সিদ্ধান্তে তিনি সায় দিয়েছেন মাত্র। আর এতেই স্থায়ীভাবে বহিষ্কার হন জাহাঙ্গাীর আলম।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের কমপক্ষে ৫জন নেতার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় গণবাংলা প্রতিবেদকের। অনেকটাই অভিন্ন সুরে তারা বলেন, ওই (গাজীপুর সিটি নির্বাচনের মনোনয়নকালে) মুহুর্তে উত্তপ্ত পরিস্থিতিটা আমাদের দলের মধ্য থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল। ১৪ মে দলের সম্পাদকমন্ডলীর বৈঠকে শাস্তির সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে অনেকেই জাহাঙ্গীরকে ডেকে কথা বলার পক্ষে ছিলেন। দলীয় সভাপতির কাছে নিয়ে গিয়ে গোপনে সমস্যার সমাধান করা যেত-যেমনটি নারায়নগঞ্জ সিটি নির্বাচনে শামীম ওসমান-আইভিকে গণভবনে ডেকে দুই মেরু এক করা হয়েছিল। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের সমস্যা নারায়ণগঞ্জের মত জটিল ছিল না। ছিল শুধু আমাদের সদিচ্ছার অভাব। সেদিনের বৈঠকের শুরুটাই ছিল উত্তপ্ত। চাইলেই কেউ এর বিপরীতে কথা বলতে পারতেন না।  অনেকের কাছে মনে হয়েছে-বৈঠকটির মুল উদ্দেশ্যই ছিল জাহাঙ্গীরকে বহিষ্কার।

বহিষ্কার ও মায়ের জয়

গত ২৫ মে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এড. জাহাঙ্গীর আলম। একই সঙ্গে তার মা জায়েদা খাতুনকেও প্রার্থী করেন। প্রার্থী যাচাই-বাছাইকালে জাহাঙ্গীরের মনোনয়ন বাতিল হয়। সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত লড়েও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করতে পারেননি তিনি। ঘড়ি মার্কা নিয়ে মা জায়েদা খাতুনের নির্বাচনী মাঠে নামেন জাহাঙ্গীর। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষুদ্ধ হন। মায়ের পক্ষে ভোট করায় তাকে নির্বাচনের ঠিক ১০ দিন আগে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। নানা জটিলতার মুখোমুখি হয়েও নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে হারিয়ে জয় লাভ করেন জায়েদা খাতুন।

তারাও এখন জাহাঙ্গীরের পক্ষে

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পর থেকেই মুখ বন্ধ জাহাঙ্গীর ইস্যুতে অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংসদের কয়েকজন নেতার। জাহাঙ্গীর ও তার মাকে পরাজিত করে সহজেই নৌকার বিজয় তুলে আনতে দলীয় নেত্রীকে প্রতিশ্রুতি দেয়া নেতারা এখন একেবারে চুপ হয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ নেতাকর্মী নির্বাচনী মাঠে কাজ করেও কেন নৌকা হারল তার সঠিক জবাব আজ পর্যন্ত তারা দলীয় সভাপতির কাছে বলার সাহস পায়নি। এই ইস্যুতে সাংবাদিকদের সঙ্গেও আর কোন কথা বলতে চান না তারা। এদের মধ্যে দুইজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যারা ১৫ মে অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় নেত্রীর সামনে জোর গলায় জাহাঙ্গীর আলমকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের সুপারিশ করেছিলেন।

২৩ নভেম্বর ২০১৬। দুই মেরুতে থাকা শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গণভবনে ডেকে একত্রিত করে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীতসর্বশেষ ১২ আগষ্ট অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতা নাম প্রকাশ না করে গণবাংলাকে বলেন, বরাবরই কিছু নেতা নেত্রীর কাছে ভুলভাল উপস্থাপন করেন। তবে আজকের বৈঠকে তারা নিরব ছিলেন। হয়তো আগের কর্মকান্ডে নেত্রী তাদের ওপর মনোক্ষুন্ন তাই এখন নিরব ভূমিকা পালন করছেন তারা। তবে নেত্রী জাহাঙ্গীর আলমকে দলে ফেরালে তাকে স্বাগত জানাবেন বলেও মন্তব্য করেছেন তাদের কেউ কেউ।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুর রহমান গণবাংলাকে বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের বহিষ্কার সিদ্ধান্ত দলীয় ফোরামের মাধ্যমে হয়েছে। শুনেছি আমাদের দলীয় নেত্রীর সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম দেখা করেছেন। তাকে দলে ফেরানো হবে কিনা জানা নেই। তবে নেত্রী যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটিই চূড়ান্ত। এই মুহুর্তে এ বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দলের ফেরার সবুজ সংকেত

ইতিমধ্যে ছেলে এড. জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জায়েদা খাতুন দেখা করছেন ২বার। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছেলেকে তুলে দেন এবং রাজনীতি করার সুযোগ দিতে অনুরোধ করেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি তাকে সঠিকভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবাদুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। পরে জাহাঙ্গীর আলম ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করেন। দলের সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশনা মোতাবেক দলীয় কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছেন জাহাঙ্গীর আলম। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

দীর্ঘ ২ বছর পর রাজনীতির মাঠে জাহাঙ্গীর আলম

গত ১১ জুলাই বিকালে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের একজন নেতা ১২ তারিখের দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ঢাকার শান্তি সমাবেশে আসার নির্দেশ দেন। সুযোগটি বেশ কাজে লাগিয়েছেন তিনি। ৩শ বাস, ৭০টি প্রাইভেট গাড়িতে করে গাজীপুর থেকে দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে ডাকা শান্তি সমাবেশে যোগ দেন জাহাঙ্গীর। সেদিন শান্তি সমাবেশে টক অব বাংলাদেশে পরিণত হয় জাহাঙ্গীরের রাজনীতিতে ফেরার এই চমক। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২ বছর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের নিষ্ক্রীয়তার অবসান ঘটে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এড. জাহাঙ্গীর আলমের।